আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয়বারের বিজয় ও হাইব্রিড কালচার

বার্তা জগৎ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ৪ জুলাই ২০১৯ সময়ঃ রাত ১১ঃ৩১
আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয়বারের বিজয় ও হাইব্রিড কালচার
আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয়বারের বিজয় ও হাইব্রিড কালচার

 

বার্তা জগৎ২৪ ডেস্কঃ 

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মত ক্ষমতায় এসেছে। আওয়ামী লীগের এই ক্ষমতাসীন হওয়ার সাথে সাথে রাজনীতিতে যে বিষয়টা প্রকাশ্যে এসেছে সেটা হল হাইব্রিড কালচার। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এই অবস্থার সাথে ৭৫ পূর্ববর্তী সময়ের তুলনা করেছেন। অনেকে এটাকে রাজনীতির জন্য অশনি সংকেত হিসাবে দেখছেন। জাতীয় রাজনীতিতে এটা নতুন কোন অধ্যায়, না পুরাতনের রেষ, সেটা বিবেচনার জন্য একটু গভীরে পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে সার্বিকভাবে এটা যে ইতিবাচক কোন ফল বয়ে আনবে না সেটা বোঝার জন্য বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার পড়ে না। রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে আসে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে তৈরি হয় রাজনৈতিক চেতনা। এই হাইব্রিড কালচার থেকে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক চেতনা কখনোই সহী হতে পারে না। বরং এটি মিথ্যা চেতনা তৈরি করে। হাইব্রিড এর আরেক নাম ক্রসব্রিড। অর্থাৎ একটি জাতের জিনের সাথে অন্য একটি জাতের জিন সংশ্লেষের মাধ্যমে হাইব্রিড উৎপন্ন হয়। রাজনীতিতে এই হাইব্রিড কালচারের কারণে দলে কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি পায় সত্য। তবে ফসলের ক্ষেত্রে হাইব্রিড উচ্চ ফলনশীল হলেও স্বাদ ও পুষ্টি গুণে যেমন নিম্নমানের হয় তেমনি রাজনীতিতে কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আদর্শের ধারাটা ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। হাইব্রিডকে আমরা সংকরও বলতে পারি। এদের উৎপত্তি যেহেতু নির্দিষ্ট নয় সেহেতু এরা প্রথমে এসে ভর করে মূলধারা নেতাকর্মীদের উপর। মূলধারার নেতাকর্মীদের পিছন ভারী করার জন্য এরা প্রথম প্রথম একটু আড়াল আবডাল করে থাকে। আস্তে আস্তে নিজের গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতিতে যখন আদর্শ চর্চা বাদ দিয়ে সংখ্যাতাত্ত্বিক ধারণা প্রতিষ্ঠা পায় তখন অবশ্যম্ভাবীভাবে দলের কোর নেতাকর্মীরা নিজেদের গ্রুপ ভারী করার জন্য এদের সাদরে গ্রহণ করে। আর এরা সুযোগ মতো নিজেদের বিভিন্ন গ্রুপের সদস্য করে নেয়। এদের রেষারেষিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ে দলের নিবেদিত কর্মীরা। ফলশ্রুতিতে দেখা দেয়, দলের লোকের বিরুদ্ধে দলের লোক। আদর্শের বিরুদ্ধে আদর্শ। এটা রোধ করার উপায় হিসাবে দলের ভিতরে প্রয়োজন সুসংহত রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা। আদর্শিক ধারাকে সমুন্নত রাখার জন্য আদর্শচর্চাকারীকে পুরস্কৃত করার বিধান থাকা প্রয়োজন।  অন্য দল থেকে নতুনভাবে দলে ঢোকার পথকে রুদ্ধ করায় বিশ্বাসী হলে চলবে না। তবে অনায়াসে কাউকে সাদরে গ্রহণ করাটাও হবে দ্বিগুণ ক্ষতির কারণ। অন্য দল থেকে কেউ এই দলে আসতে চাইলে তাকে আদর্শের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে এবং বিনা প্রশ্নে আদর্শের পরীক্ষায় তাকে উত্তীর্ণ হতে হবে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে দেশের সামগ্রিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। একে অপরের পরিপূরক। দেশের অবস্থা ভালো থাকলে রাজনীতি স্থিতিশীল থাকে। আবার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় দেশ এগিয়ে যায়। আওয়ামী লীগের গত দশ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে সারাদেশে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তার স্পর্শ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও পড়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর জনগণের আস্থা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। জনগণের মনস্তত্ত্বে আওয়ামী লীগের বিশেষ করে শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন রেখাপাত করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে জনগণ তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ‘একই দল টানা দুইবার ক্ষমতায় আসতে পারবে না’- এই ভ্রান্তি থেকে সরে এসেছে। বরং আওয়ামী লীগকে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় বসিয়েছে। মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের সাথে চারপাশের অবস্থার পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। এসব পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাজনৈতিক পরিবর্তন চলমান রয়েছে। আবার আওয়ামী লীগের ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। জনগণকে এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে চলতে শেখানোটা ছিল দলটির জন্য চ্যালেঞ্জ। যেটাতে অনেকাংশেই সফল হয়েছে দলটি। সবাই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে চলতে পারে না বা চলতে চায় না। জড়ধর্ম বলে বিশ্বজগতে একটি নিয়ম আছে। স্থির থাকা বা পুরাতনকে আঁকড়ে ধরা যার প্রবণতা। এটা শুধু বস্তুজগতে নয়, চিন্তার জগতেও এই জড়ত্ব ক্রিয়া করে। সেটা কিছু রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতিতে বিরাজমান বলে জনগণ দ্বারা তারা প্রত্যাখ্যাত। এই জড়ত্ব যাতে জাতীয় অগ্রগতির পথে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায় সেজন্য এটাকে অতিক্রম করতে হলে পুরাতনের সাথে নতুনের সমন্বয় করে সময়ের প্রেক্ষাপটে খানিকটা স্বতন্ত্র রূপদান দরকার। সোজা কথায় বলতে গেলে, সময়কে বিবেচনায় রেখে রাজনৈতিক কর্মপন্থা হাতে নেওয়াটা গণসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের কাজ। রাজনৈতিক দল গণকে কল্পনার আকাশকুসুম না দেখিয়ে বাস্তবের কাননকুসুম ফুটাবে। রাজনৈতিক দল কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় যে সেখানে জনগণকে দর্শন শেখানো হবে। তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে দর্শনহীন দল খুব বেশিদিন টিকে থাকে না। সুতরাং আওয়ামী লীগের মতো একটি জনগণতান্ত্রিক দলের চিন্তায় থাকবে দর্শন কিন্তু কর্মে থাকতে হবে বাস্তবতা।

সর্বশেষ বলতে চাই, একটি দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের একটা মাপকাঠি দরকার। তুল্যমূল্যে নতুন ও পুরাতন কর্মীকে একই পাল্লায় মাপাটা সামঞ্জস্যপূর্ণ না। তুল্যমূল্যে পুরাতন কর্মীদের অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। দলের প্রধান নেতাদের উদাসীনতা বা প্রতিহিংসার শিকার যাতে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা না হয়। সেটা যদি হয়, তাহলে আমরা হাইব্রিড কালচারের বাড়বাড়ন্ত দেখতে পাবো। এতে দিনশেষে হেরে যাবে দলের আদর্শিক ধারা, বাঁক বদল করে নিবে রাজনীতির মূলস্রোত। যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসে, যারা নিঃস্বার্থভাবে দলকে সমর্থন করে তাদের কারোরই এটা কাম্য নয়।

লেখকঃ সায়েম খান

রাজনৈতিক কর্মী।

 

Share on: