ওপার বাংলা থেকে এসে এপার বাংলার চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছিলেন যিনি!

মোঃফজলুল হক পাভেল, বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিতঃ ২০ মার্চ ২০১৯ সময়ঃ দুপুর ২ঃ৫০
ওপার বাংলা থেকে এসে এপার বাংলার চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছিলেন যিনি!
ওপার বাংলা থেকে এসে এপার বাংলার চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছিলেন যিনি!

মোঃফজলুল হক পাভেল, বিশেষ প্রতিনিধি:

আব্দুর রাজ্জাক, যিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র অভিনেতা এবং যিনি নায়ক রাজ রাজ্জাক নামেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা 'চিত্রালী' সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাকে নায়ক রাজ উপাধী দিয়েছিলেন।

নিজের জন্মস্থান কলকাতায় ৭ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মঞ্চনাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার অভিনয় জীবন শুরু হয়। ১৯৬৬ সালে ১৩ নং ফেকু ওদাগার লেন চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে। তিনি জহির রায়হানের বেহুলা চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রের মাধ্যমে নিজের অবস্থান পাঁকাপোক্ত করে নেন। এর পরে আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ৬০ এর দশকের শেষের দিকে এবং ৭০ এর দশকেও তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রধান অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

অভিনয় জীবনে তিনি 'বেহুলা' 'আগুন নিয়ে খেলা' 'এতোটুকু আশা' 'নীল আকাশের নিচে' 'জীবন থেকে নেয়া' 'ওরা এগারো জন' 'অবুঝ মন' 'রংবাজ' 'আলোর মিছিল' 'অশিক্ষিত' 'ছুটির ঘন্টা' এবং 'বড় ভালো লোক ছিলো' সহ মোট তিনশোটি বাংলা ও ঊর্ধু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সেই সাথে তিনি ১৬ টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন।

২০১৫ সালে সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তাঁকে স্বাধীনতা পুরষ্কারে ভূষিত করেন ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ এবং ১৯৮৮ সালে তিনি মোট পাঁচবার শীর্ষ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার লাভ করেন। ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে তাঁকে আজীবন সম্মাননা পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। এছাড়াও তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কার সহ অসংখ্য পুরষ্কার লাভ করেন।

এবার চলুন নায়ক রাজ রাজ্জাকের কিছু ব্যক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য তথ্যগুলো জেনে নেয়ার চেষ্টা করি। রাজ্জাক ১৯৪২ সালের ২৩ শে জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ কলকাতার টলিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আকবর হোসেন এবং মাতার নাম নিসারুন নেসা।রাজ্জাকরা ছিলেন নাকতলা এলাকার জমিদার। তিনি কলকাতাতেই পড়াশোনা করতেন। স্কুলে তিনি অঙ্কে কাঁচা ছিলেন। এ প্রসঙ্গে রাজ্জাকের বাল্যবন্ধুরা বলতেন, 'অঙ্কটা অন্তত ভালো করে শেখ, যোগ বিয়োগ ঠিকঠাক করে না শিখলে পরিবারের এতো সম্পত্তি সামলে রাখবি কি করে? 'সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সরস্বতি পূজা চলাকালীন মঞ্চনাটকে অভিনয়ের জন্য তার শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য বেছে নেন। শিশু কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক বিদ্রোহীদের গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে মধ্য দিয়ে সম্পৃক্ততা শুরু হয়।

অভিনয়ের জন্য ১৮ বছর বয়সে মুম্বাইয়েও যান রাজ্জাক। রাজ্জাক ১৯৬২ সালে লক্ষী কে বিয়ে করেন।টলিগঞ্জের এক আত্মীয়ের বাড়ির পাশে ছিলো লক্ষীদের বাড়ি। সেই আত্মীয়দের একজন লক্ষীকে বাড়ির পাশে দেখে পছন্দ করেন এবং বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান। সেদিন রাজ্জাক আর লক্ষীর আংটি বদল হয়। এর দুই বছর পরে তাদের বিয়ে হয়। নিজের নাম প্রসঙ্গে লক্ষী দৈনিক প্রথম আলোতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'অনেকেই আমাকে হিন্দু মনে করেন।আমার আব্বা আমাকে আদর করে ডাকতেন লক্ষী বলে। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে এক রাতে বাড়ি ছেড়ে এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরের দিন ২৬শে এপ্রিল সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। তার সঙ্গে ছিলো স্ত্রী লক্ষী ও পুত্র বাপ্পারাজ এবং পীযুশ বসুর দেওয়া একটি চিঠি ও পরিচালক আব্দুল জব্বার খান ও শব্দগ্রাহক মণি বোসের ঠিকানা। স্ত্রী পুত্রকে শরনার্থী শিবিরে রেখে তিনি আব্দুল জব্বার খানের সাথে সাক্ষাৎ করলে খান তাকে আশ্বাস দেন। তখন রাজ্জাক ৮০ টাকা মাসিক ভাড়ায় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে কমলাপুরে এক বাসা ভাড়া করেন। পরে তিনি সুভাষ দত্ত, সৈয়দ আওয়াল, এহতেশামসহ আরও চলচ্চিত্রকারদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আব্দুল জব্বার খানই তাকে ইকবাল ফিল্মসে কাজ করার সুযোগ দেন। ১৯৬৪ সালে তিনি কামাল আহমেদের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে 'উজালা' চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান। সহকারী পরিচালক হিসেবে তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ছিল 'পরওয়ানা'। কিন্তু ৮০ ভাগ কাজ হওয়ার পর তিনি এই ছবির কাজ ছেড়ে দেন।

চলচ্চিত্রে আগমনের প্রথমদিকে রাজ্জাক তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে "ঘরোয়া" নামের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পান। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি সালাউদ্দিন প্রোডাকশনের ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন এবং কার বউ, ডাক বাবু, আখেরী স্টেশন-সহ আরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন।

১৯৬৬ সালে জহির রায়হান পরিচালিত 'বেহুলা' চলচ্চিত্রে সুচন্দার বিপরীতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। এতে লখিন্দর চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পৌরাণিক কাহিনীধর্মী এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। এই ছবির সফলতার পরে জহির রায়হান রাজ্জাক-সুচন্দাকে নিয়ে নির্মাণ করেন আনোয়ারা (১৯৬৭) এবং সুয়োরাণী দুয়োরাণী (১৯৬৮)। সাহিত্যিক মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত আনোয়ারা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত আনোয়ারা চলচ্চিত্রটিতে তিনি আনোয়ারা চরিত্রের স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। লোককাহিনীধর্মী সুয়োরাণী দুয়োরাণী ছবিতে তাকে রাখালের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানো এক শাহজাদার চরিত্রে দেখা যায়। ১৯৬৭ সালে তিনি সুজাতার বিপরীতে আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত আগুন নিয়ে খেলা এবং ম. হামিদ পরিচালিত অপরাজেয় ছবিতে অভিনয় করেন। এই সময়ে সুচন্দার বিপরীতে তিনি আমজাদ হোসেন পরিচালিত জুলেখা (১৯৬৭) ও সংসার (১৯৬৮), রহিম নেওয়াজ ও নূরুল হক পরিচালিত দুই ভাই (১৯৬৮), নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত কুচবরণ কন্যা (১৯৬৮), রহিম নেওয়াজ পরিচালিত মনের মত বউ (১৯৬৯) এবং আমির হোসেন পরিচালিত রোম্যান্টিকধর্মী যে আগুনে পুড়ি (১৯৭০) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

রাজ্জাক ১৯৬৮ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত আবির্ভাব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জুটি গড়েন কবরীর সাথে। এই জুটিকে একই বছর দেখা যায় আব্দুল জব্বার খানের বাঁশরী ছবিতে। এছাড়া তিনি মোহসীন পরিচালিত গৌরী ছবিতে অভিনয় করেন। পরের বছর তিনি নারায়ণ ঘোষ মিতার রোম্যান্টিকধর্মী নীল আকাশের নীচে ছবিতে মামুন চরিত্রে অভিনয় করেন। এতে তার বিপরীতে ছিলেন কবরী এবং এই ছবি দিয়ে রাজ্জাক-কবরী জুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। একই বছর তাদের কাজী জহিরের বিয়োগাত্মক ময়নামতি (১৯৬৯) চলচ্চিত্রে দেখা যায়।

১৯৭০ সালে রাজ্জাক প্রখ্যাত পরিচালক জহির রায়হান পরিচালিত রাজনৈতিক-ব্যঙ্গধর্মী জীবন থেকে নেয়া ছবিতে অভিনয় করেন। গণঅভ্যুত্থান এবং আইয়ুবের সামরিক শাসন নিয়ে রাজনৈতিক-ব্যঙ্গধর্মী এই ছবিতে রাজ্জাককে পরাধীন দেশের একজন সচেতন নাগরিক ফারুক চরিত্রে দেখা যায়। এতে তার বিপরীতে ছিলেন সুচন্দা। একই সালে মধ্যবিত্ত ঢাকার নাগরিক সমস্যা ও যাপিত জীবনের গল্প নিয়ে এহতেশাম পরিচালিত রোম্যান্টিক-নাট্যধর্মী পীচ ঢালা পথ ছবিতে তার বিপরীতে প্রথমবার দেখা যায় ববিতাকে। ববিতা এর পূর্বে তার এবং সুচন্দার মেয়ের ভূমিকায় সংসার ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবির সফলতার ধারাবাহিকতায় রাজ্জাকা- ববিতা জুটিকে নিয়ে বাবুল চৌধুরী নির্মাণ করেন 'টাকা আনা পাই' (১৯৭০) এবং নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন স্বরলিপি (১৯৭০)। পিতা-পুত্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে নির্মিত টাকা আনা পাই ছবিতে অভিনয় করেন। এতে তার পিতার চরিত্রে দেখা যায় শওকত আকবরকে। ছবিতে তাকে উচ্চ শিক্ষিত দরিদ্র পরিবারের সন্তান শহীদ চরিত্রে দেখা যায়, যে পরবর্তীতে বড়লোকের মেয়ের জামাই হয়ে পিতৃঋণ শোধ করার বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

রাজ্জাক-কবরী জুটি জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় এই জুটিকে নারায়ণ ঘোষ মিতার ক খ গ ঘ ঙ (১৯৭০) ও দীপ নেভে নাই (১৯৭০), নজরুল ইসলামের দর্পচূর্ণ, নূরুল হক বাচ্চুর যোগ বিয়োগ (১৯৭০), আব্দুল জব্বার খানের কাঁচ কাটা হীরে (১৯৭০), কামাল আহমেদের অধিকার (১৯৭০), বাবুল চৌধুরীর আঁকা বাকা (১৯৭০), আলমগীর কুমকুমের স্মৃতিটুকু থাক (১৯৭১) এবং আলী কাউসারের গাঁয়ের বধূ (১৯৭১) চলচ্চিত্রে দেখা যায়।ক খ গ ঘ ঙ ছবিতে তাকে দেখা যায় এক দুরন্ত যুবক মন্টু চরিত্রে, যে তার পরিবারকে প্রচণ্ড ভালোবাসে।

১৯৭১ সালে তিনি অশোক ঘোষ পরিচালিত নাচের পুতুল ছবিতে অভিনয় করেন। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন শবনম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লাভের পর ১৯৭২ সালে প্রথম মুক্তি পায় রাজ্জাক অভিনীত মানুষের মন ছবিটি। মোস্তফা মেহমুদ পরিচালিত এই ছবির ব্যবসায়িক সফলতার মধ্য দিয়ে রাজ্জাকের যুগের সূচনা হয়। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন ববিতা। এই ছবির সাফল্যের ধারাবাহিকতায় পরের বছর রাজ্জাক আর ববিতা জুটিকে নিয়ে অশোক ঘোষ নির্মাণ করেন প্রিয়তমা (১৯৭৩) এবং কবীর আনোয়ার নির্মাণ করেন স্লোগান (১৯৭৩)। প্রিয়তমা চলচ্চিত্রে খুরশিদ আলমের কণ্ঠে এবং রাজ্জাকের ঠোঁটে "আমার এই কলজেটায় চাক্কু মেরে" গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ছবিটিও জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৯৭২ সালে 'অবুঝ মন' চলচ্চিত্র দিয়ে রাজ্জাকের জুটি গড়ে ওঠে শাবানার সাথে। পরে তিনি শাবানার বিপরীতে সর্বাধিক ৪০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।কাজী জহির পরিচালিত 'অবুঝ মন' ছবিতে রাজ্জাক সদ্য পাস করা এক ডাক্তারের চরিত্রে অভিনয় করেন, যে ধর্ম ও সমাজের খাতিরে তার প্রেমকে বিসর্জন দেয়।এছাড়া একই বছর তাকে শাবানার বিপরীতে দেখা যায় 'ওরা ১১ জন' এবং 'চৌধুরী বাড়ি' ছবিতে। মাসুদ পারভেজ প্রযোজিত এবং চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ওরা ১১ জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র। এছাড়া ১৯৭২ সালে তিনি কামাল আহমেদের অশ্রু দিয়ে লেখা, বাবুল চৌধুরীর প্রতিশোধ, ইবনে মিজানের কমলা রাণীর দীঘি, এস এম শফির ছন্দ হারিয়ে গেল এবং নারায়ণ ঘোষ মিতার এরাও মানুষ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

১৯৭৬ সালে রাজ্জাক জহিরুল হক পরিচালিত 'কি যে করি' ছবিতে বাদশাহ চরিত্রে অভিনয় করেন। এক ধনী ব্যক্তির নাতনী শাহানা তার দাদুর সম্পত্তি ভোগ করার জন্য ফাঁসির আসামী বাদশাহকে বিয়ে করে কিন্তু ভাগ্যক্রমে সে খালাস পেলে তাকে গ্রহণ করে শাহানা। ছবিতে তার বিপরীতে শাহানা চরিত্রে ছিলেন ববিতা। রাজ্জাক এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তার প্রথম শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর তিনি আলমগীর কুমকুম পরিচালিত গুন্ডা ছবিতে বাহাদুর চরিত্রে অভিনয় করেন। এতে দেখা যায় তিনি একজন রাস্তার গুন্ডা থেকে ভালো মানুষে রূপান্তরিত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি আজিজুর রহমান পরিচালিত অমর প্রেম, অশোক ঘোষ পরিচালিত মতি মহল এবং আব্দুল লতিফ বাচ্চুর যাদুর বাঁশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

১৯৭৭ সালে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র অনন্ত প্রেম।পথ-রোমাঞ্চধর্মী রোম্যান্টিক এই চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রায়িত হয়েছিল বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের প্রথম চুম্বন দৃশ্য। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যের জন্য রাজ্জাক ববিতার মধ্যে চুম্বন দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তা মূল ছবি থেকে বাদ পড়ে।

১৯৭৮ সালে রাজ্জাক আজিজুর রহমান পরিচালিত অশিক্ষিত চলচ্চিত্রে গ্রামের একজন পাহারাদার চরিত্রে অভিনয় করেন। অশিক্ষিত পাহারাদার গ্রামের এক অনাথ কিশোরের নিকট লেখাপড়া শিখে এবং পরে সেই কিশোরের খুনের সাক্ষী হিসেবে নিজ হাতে দস্তখত করে। ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হয় এবং এই ছবিতে রহমত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য রাজ্জাক শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে (বুলবুল আহমেদের সাথে যৌথভাবে) তার দ্বিতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। দিলীপ বিশ্বাস পরিচালিত জিঞ্জির ছবিতে তিনি প্রথমে কলেজ ছাত্র রাজন চরিত্রে এবং তার স্ত্রীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ডাকু ফরহাদে পরিণত হন। এতে তার সহশিল্পী ছিলেন সোহেল রানা ও আলমগীর।

রাজ্জাক ১৯৮২ সালে 'বড় ভাল লোক ছিল' ছবিতে অভিনয় করেন। মহিউদ্দিন পরিচালিত ছবিটির রচনা করেন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক। এই ছবিতে রাজ্জাককে একজন পীরের সন্তান চরিত্রে দেখা যায়, যার নিজের মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তি রয়েছে। কিন্তু তার বাবার বন্ধুর মেয়ের (অঞ্জু ঘোষ) প্রতি তার মোহ জাগলে তার সেই ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকলে সে এই পথ থেকে ফিরে এসে মানবসেবায় ব্রতী হয়। এই ছবিতে ইয়াসিন চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে তার তৃতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৮৩ সালে মুক্তি পায় রাজ্জাক পরিচালিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র বদনাম। পরিচালনার পাশাপাশি তিনি এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেন। পরের বছর তিনি পরিচালনা করেন অভিযান। সৈয়দ শামসুল হকের কাহিনী অবলম্বনে তিন বন্ধুর ব্যবসায়িক যাত্রা নিয়ে নির্মিত রোমাঞ্চকর এই চলচ্চিত্রে তিনি রাজু চরিত্রে অভিনয় করেন। তার অপর দুই বন্ধু চরিত্রে ছিলেন জসিম ও ইলিয়াস কাঞ্চন। ছবিটি ৯ম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে একটি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। এই বছর তিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস চন্দ্রনাথ অবলম্বনে নির্মিত একই নামের চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত হয়। রাজ্জাক এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তার চতুর্থ শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

১৯৮৯ সালে রাজ্জাক জ্বীনের বাদশা চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এই ছবিতে অভিনয় করেন তার বড় পুত্র বাপ্পারাজ। ছবিটি একটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। এই দশকে তার পরিচালিত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলো হল প্রফেসর (১৯৯২), বাবা কেন চাকর (১৯৯৭), উত্তর ফাল্গুনী (১৯৯৭)। বাবা কেন চাকর ছবিতে রাজ্জাক বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন। তার দুই সন্তান চরিত্রে অভিনয় করেন আবুল কাশেম মিঠুন এবং বাপ্পারাজ।

২০১৪ সালে তিনি নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুল পরিচালিত এবং ফেরদৌস আহমেদ প্রযোজিত এক কাপ চা চলচ্চিত্রে অতিথি চরিত্রে এবং সামিয়া জামান পরিচালিত আকাশ কত দূরে ছবিতে অভিনয় করেন।২০১৫ সালে তার বড়পুত্র বাপ্পারাজ পরিচালিত কার্তুজ ছবিতে অভিনয় করেন। এতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন তারই ছোট পুত্র সম্রাট। ২০১৬ সালে রাজ্জাক চেয়ারম্যানের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র, টেলিভিশন চলচ্চিত্রে চেয়ারম্যানের ভূমিকায় অভিনয় করেন। এটি তার নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রাজলক্ষী প্রডাকশন থেকে নির্মিত হয় এবং পরিচালনা করেন তার পুত্র খালিদ হোসেন সম্রাট। এর আগেও রাজ্জাক সম্রাটের পরিচালনায় দায়ভার টেলিভিশন চলচ্চিত্রে কাজ করেন।

কিংবদন্তী এই নায়ক রাজ ২০১৭ সালের ২১ শে আগস্ট সন্ধ্যা ৬:১৩ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপতালে মৃত্যুবরণ করেন। ২৩শে আগস্ট তাঁকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বার্তাজগৎ২৪/ এ কে