কবির বোধগম্যতাই বলতে শিখিয়েছিল- ' আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে'

বার্তা জগৎ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ২৮ এপ্রিল ২০১৯ সময়ঃ রাত ২ঃ১৪
কবির বোধগম্যতাই বলতে শিখিয়েছিল- ' আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে'
কবির বোধগম্যতাই বলতে শিখিয়েছিল- ' আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে'

 

বার্তা জগৎ২৪ ডেস্কঃ

নেট ঘেটে হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে ফিচার দেখলাম খুব কম। আবার তার সম্পর্কে ইতিবাচক লেখা নাই বললেই চলে। নেতিবাচক মন্তব্যের ভীড়ে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেছে আমাদের সময়ের হুমায়ুন আজাদকে। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে এপার বাংলায় গত এক শতকে তার মতো বড় মাপের সাহিত্যিকের আবির্ভাব হয় নি বলে মনে করেন কেউ কেউ। এমনকি নিজের সাহিত্যকর্ম নিয়ে তার মধ্যে সর্বদা একটা নামজাদা স্বভাব বিরাজমান ছিল। তার লেখনীতে মৌলিকত্বের ছাপ রয়েছে বলে তিনি দাবি করলেও অনেকে তথ্য প্রমাণ হাজির করে হুমায়ুন আজাদের লেখার মৌলিকত্ব খারিজ করে দেন। এই দলে যোগ দিয়েছিলেন তার সমসাময়িক লেখক আহমদ ছফা। হুমায়ুন আজাদের লেখনীতে চৌর্যবৃত্তি দেখেছেন ছফাসহ অনেকেই। আমাদের নগরকেন্দ্রিক সাহিত্য সমাজে আবির্ভূত তরুণেরা আগে থেকে নিজেদেরকে বিশেষ লেখকদের উত্তরসূরিতার ভেদ বিভেদে যুক্ত করে ফেলেন। এমনি একটা দ্বন্দ্ব আমরা ঢাকা কেন্দ্রিক সাহিত্য সমাজে দেখি। যেটাতে একগোষ্ঠী অনুরাগ আহমদ ছফার প্রতি এবং আরেকটি গোষ্ঠীর হুমায়ুন আজাদের প্রতি। পন্থা অবলম্বন করে সাহিত্য রচনার ধারাটি আমরা আমদের লৌকিক সাহিত্যেও দেখি। যদিও লৌকিক সাহিত্যের আবেদন আমাদের মাঝে আগের মতো নেই। সময়ের বদলেই সব বদলায়। তেমনি আমাদের গ্রামগুলো বদলে হয়ে উঠছে নগর। বদলে গেছে আমাদের সাহিত্যের গতিপথ। লৌকিক সাহিত্যের চাইতে নাগরিক সাহিত্যের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। হুমায়ুন আজাদ গত দশক পর্যন্ত নাগরিক সাহিত্য সমাজের একজন প্রতিনিধিত্বকারী। হুমায়ুন আজাদ কত বড় বা ছোট মাপের লেখক- এটা মুল্যায়নের জন্য আমি ব্যবচ্ছেদ করছি না। এমনটা করা আমার জন্য যেমন ধৃষ্টতার সামিল একইভাবে আমি তেমন কোন গবেষকও নই। তাই আমি হুমায়ুন আজাদের প্রতি চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উপেক্ষা করে তাকে বিবেচিত করি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় অচলায়তনের বিরুদ্ধে একজন সংগ্রামী যোদ্ধা হিসাবে। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়েও এই ধরনের একটা প্রোপাগান্ডা আছে। যে তাঁর গানে তৎকালীন আইরিশ গানের ঢঙ আছে। কিন্তু তারপরও বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের রচিত গীত এক ও অনন্য। শুধুমাত্র বাংলার যুৎসই শব্দের দোত্যনার জন্য। হুমায়ুন আজাদের মন্তব্যের মধ্যে স্ববিরোধিতা পরিলক্ষিত। তিনি রবীন্দ্রনাথকে ভিক্টোরিয়ান দ্বারা প্রভাবিত বলে অভিযুক্ত করেন। কিন্তু অধিকাংশ লেখক তাকেও এই দোষে দুষ্ট বলে মনে করেন। এই দোষে তিনি যদি দুষ্ট হয়েও থাকেন তবে দুশ্চরিত ছিলেন না। পাশ্চাত্য দর্শনের প্রগতিশীলতার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে দেখানোর জন্য নিজের জীবন ঝুঁকিতে রেখে সব সময় কলম চালিয়েছেন। এদেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জেকে বসা কুসংস্কারে বর্ধিত শরীরের অচলায়তনকে কড়াভাবে আঘাত করার প্রত্যয় নিয়ে সাহস তিনি দেখিয়েছেন। অধিকাংশ পাঠক তার সাথে পরিচিত হন 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' পড়ে। আমার ক্ষেত্রে এর ব্যতয় ঘটে। হুমায়ুন আজাদের সাথে আমি মুখোমুখি হই 'আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম' প্রবন্ধ গ্রন্থের মাধ্যমে। আমাকে তিনি নতুনভাবে চিন্তার খোরাক জোগান। এরপর পড়ি তার রচিত 'সবকিছু ভেঙ্গে পড়ে'। যা আমার ব্যক্তিজীবনের দর্শনকে নাড়িয়ে নতুন আমিকে পুরানো আমি'র সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমি লক্ষ্য করি কি, কি নির্বিঘ্নে আমার পুরাতন আমি হেরে যাচ্ছে নব জাগরণের ছোঁয়ায়। একে একে শেষ করি- একটি খুনের স্বপ্ন, রাজনীতিবিদগণ, নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু, আততায়ীর সাথে কথোপকথন, কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ, ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল। 'ফালি ফালি করে কাটা চাঁদ' পড়তে গিয়ে আমি দাঁড়াই নারী মনস্তত্ত্বের মুখোমুখি। দেখার চেষ্টা করি, কিভাবে একজন নারী তার অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্বের বিশুদ্ধতা নির্মাণ করেন। 'কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ' পড়তে গিয়ে দেখি কিভাবে তিনি সামাজিক প্রথার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রেমের জয়গান গান। তাইতো তিনি অবলীলায় বলেন, ' ক্লান্তিহীন সুখকর প্রেমের সন্তান অবৈধ'। এই অবৈধতা দান করে সমাজ বা রাষ্ট্র। কিন্তু সামাজিক ও রাষ্ট্রিক বেড়াজাল ছিন্ন করে এই সম্পর্ককে তিনি দেখেন ক্লান্তিহীন ও সুখকর। একজন লেখক ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে কতখানি হলে এমন সামাজিক অবৈধতার বিরুদ্ধে নগ্নভাবে বলতে পারেন। পড়তে গিয়ে শেষ করা হয় নি- 'নারী', 'আমার অবিশ্বাস' এবং অনূদিত 'দ্বিতীয় লিঙ্গ'। হয়তো তখনকার বয়সে মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা এই দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে নি। তৎপরবর্তী সময়ে আর শেষ করা হয়ে ওঠে নি। অনেকে 'নারী' প্রবন্ধটিকে একটি সংকলন হিসাবে দেখেন। আমি সম্পূর্ণভাবে একমত না। সংকলনের সাথে 'নারী' প্রবন্ধে তার মতামত আমাদের সমাজ ও সাহিত্যে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবকে ধাক্কা দেয়। 'আমার অবিশ্বাস' গ্রন্থটিকে অনেকে বার্ট্রান্ড রাসেলের 'Why I am not a Christian'-এর অনুকরণে। আমার প্রশ্ন হল, ' এমন অনুকরণের সাহস দেখানোর ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে তিনি এক ও অদ্বিতীয়'। লেখক হুমায়ুন আজাদের মতো কবি হুমায়ুন আজাদও ছিলেন প্রথাবিরোধী কবি। 'অলৌকিক ইস্টিমার' দিয়ে কবি সত্ত্বার যাত্রা শুরু। ষাটের দশকের এই কবি অবলীলায় স্বীকার করেছেন তার বর্তমান সময়টি তার ছিল না। তাই তো তিনি সময়ের বাইরে গিয়ে অসময়ের কবিতাগুলো গ্রন্থিত করেন 'আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে'। পাশ্চাত্য দর্শনে বিশ্বাসী প্রথাবিরোধী লেখক ভুলে যান নি তার গ্রাম ও প্রকৃতিকে। তাই স্মৃতিকাতর হয়ে লিখতে দেখি--- 

' ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।

ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।

ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।

ভালো থেকো'।

হুমায়ুন আজাদ সবসময় মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়াশীল কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে সোচ্চার ছিলেন। প্রতিক্রিয়াশীল এই চক্র তাকে শত্রু জ্ঞান করত। অশুভের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি লিখে গেছেন জ্ঞানের পক্ষে, প্রগতিশীলতার পক্ষে নব দিগন্তের হাতছানিতে। কিন্তু তার বোধগম্যতাকে সত্য প্রমাণ করে তার উপর হামলা চালিয়ে মৌলবাদীরা সময়টাকে তাদের করে নেয়। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তার উপরে হামলা করে মৌলবাদী চক্র। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট জার্মানিতে মৃত্যুবরণ করেন বাঙালির চেতনাকে নাড়িয়ে দেয়া এই লেখক।

কবি অন্যদের সময়ে বেঁচে ছিলেন, না সময় কবিকে ধারণ করতে চায় নি? এই প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিতভাবে সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উত্তর খুঁজতে আমরা অপারগ।

লেখক- সায়েম খান 

কবি ও প্রাবন্ধিক।

Share on: