ক্যান্সার জয় করা এক ক্রিকেটারের নাম যুবরাজ

বার্তা জগৎ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ২৫ জুলাই ২০১৯ সময়ঃ রাত ১ঃ২০
ক্যান্সার জয় করা এক ক্রিকেটারের নাম যুবরাজ
ক্যান্সার জয় করা এক ক্রিকেটারের নাম যুবরাজ

 

ইয়াসিন আরাফাতঃ 

শংকা ছিল তার যে কোন সময় হুট করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমানোর। শংকা ছিল ব্যাট বল নিয়ে ক্রিকেট মাঠে নামলেও সেখান থেকে তার আর জীবিত উঠে নাও আসার। কিন্তু একজন ক্যান্সারের রোগী হওয়ার পরও সেসবে  তার থোড়াই কেয়ার। তিনি ক্রিকেট খেললেন,দলকে জেতালেন বিশ্বকাপ আর নিজেও জিতলেন বিশ্বকাপের সেরার মুকুট। বলছিলাম ভারতীয় ক্রিকেট দলের একসময়ের নিয়মিত ও একমাত্র পরীক্ষিত বাঁহাতি স্পিন অলরাউন্ডার যুবরাজ সিংয়ের কথা। যে কিনা ২০১১ বিশ্বকাপে ব্যাটে বলে দারুণ পারফর্ম করে দলকে এনে দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ শিরোপা। নিজেও ছিনিয়ে নিয়েছিলেন টুর্নামেন্টে সেরার পুরস্কার। অথচ সে সময়ে তার শরীরে ধীরে ধীরে ক্যান্সার বাসা বাধতেছিল। টিউমার ধরাও পড়েছিল। তার আগে অফফর্মের কারণে তাকে তো বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নেওয়াই হয় না। কাপ্তান ধোনির জোরাজুরিতে শেষে সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই তিনি দলকে জিতিয়েছিলেন বিশ্বকাপ শিরোপা। হঠাৎ করে অবসরে যাওয়া, তাছাড়া তার ক্যারিয়ার জুড়ে উত্থান পতনের গল্পও ব্যাক্তিগত জীবনেও ৮/১০ টা বলিউড অভিনেত্রীর সাথে প্রেমের গুঞ্জন। সব মিলিয়ে তার জীবন যেন রহস্যে ঘেরা। যে রহস্যের গল্প শুনতে ভালোবাসেন সকলে।তাই আমাদের আজকের আলোচনায় জানবো টি-২০ তে ছয় বলে ছয় ছক্কা হাঁকানো একমাত্র ক্রিকেটার ও ভারতীয় হার্ড হিটার অলরাউন্ডার যুবরাজ সিংয়ের নানান অজানা তথ্য। 

যুবরাজ সিং ১৯৮১ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের এক সিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা যোগরাজ সিংও ছিলেন একজন ক্রিকেটার। তবে নিজেকে উচু পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হন। আর তাই নিজের স্বপ্নের পুরোটাই ছেলের উপর দেন। তিনি ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর জন্য কতোটা উঠে পড়ে লেগেছিলেন সেটা বোঝার জন্য একটা ঘটনাই যথেষ্ট। একবার অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় রোলার স্কেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতে আনলেও নাকি যুবরাজের বাবা সে পদক ঘরে উঠতে দেননি। পদক বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তিনি যুবরাজকে ক্রিকেটের কথা বলেছিলেন। যুবরাজের বেড়ে ওঠা সে সময়টাই সেখানে ছেলেদের ক্রিকেট খেলার সময় আসতো নানান বাধা। সেখানে যুবরাজের উপর প্রত্যাশার চাপ থাকলেও বাবার সকল সহযোগিতা তিনি সবসময় পেয়েছেন। তবে বাবার শুধু সমর্থনই পাননি, ক্রিকেটে ভালো করতে না পারার কারণে বাবার কটাক্ষও কম শুনতে হয়নি তাকে। এমনকি একবার তো স্কুল লেভেলে প্রায় রান না পাওয়ায় ছেলের হাতের দুধের গ্লাসও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন বাবা যোগরাজ সিং। বোঝেন এবার ছেলের ক্রিকেটের প্রতি বাবার সিরিয়াসনেস কতটা উচুতে ছিল। তবে বাবার এমন আচরণকে যুবরাজ ব্যাথা নয় শক্তি হিসেবে নিয়েছিলেন। তারপর থেকে বয়সভিত্তিক দলগুলোতে তার একের পর এক সফলতা জায়গা করে দেয় ১০ না পেরোনো ক্রিকেটারদের দলে এবং সেই সুবাদে মাত্র ১৭ বছর বয়সে যায়গা পেয়ে যান রঞ্জি ট্রফিতে। খেলে ফেললেন প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট। এরমাঝে ক্রিকেটটা তিনি কিভাবে খেলেন সেটা জানিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিরুদ্ধে ৫৫ বলে ৮৯ রানের বিধ্বংসী ইনিংসে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া তাই নিশ্চিতই ছিল। মোহাম্মদ কাইফের নেতৃত্বে সেবার ভারত শিরোপা জিতেছিল আর যুবরাজ সিং ম্যান অব দ্যা টুর্নামেন্ট হয়েছিলেন। সেখান থেকে ২০০০ সালে আইসিসি নকআউট বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তার অভিষেক ম্যাচ। গ্লেন ম্যাগ্রা, লিদের সামনে ৮০ বলে রান করেছিলেন ৮৪ রান। ভারত ম্যাচ জিতেছিলো ২০ রানে। এই ইনিংসে নিজের সামর্থতো জানান দিয়েছিলেন তো বটেই তার সামনের প্রতিপক্ষের বোলারদের সাধ্য সামর্থই তখন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল।পরিসংখ্যান জানাচ্ছে তার অভিষেক ইনিংসের ৮৪ রান ভারতের হয়ে তৎকালীন সর্বোচ্চ। তা দেখে ক্রিকেটবোদ্ধারা তাকে ক্রিকেট বিশ্বে যুবরাজ নয় রাজা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। সেখান থেকেই তার শুরু। পরে দুম্যাচে ছোট ছোট ইনিংস খেলে নিজের আগ্রাসী ভাবটা তুলে ধরতে সক্ষম হন। সেখান থেকে উঠে এসে তার ক্যারিয়ারের মতোই ভালো মন্দ মিলিয়ে কেটেছিল ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ। পাকিস্তানের বিপক্ষে এনে দিয়েছিলেন জয়। কেনিয়ার বিরুদ্ধে করেছিলেন অর্ধশতক। ততোদিনে যা করেননি সেই শতকেরও দেখা পেয়ে গেলেন সেই বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের বিপক্ষে ঢাকারই বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। অভিষেকের পর ততদিন খেলে ফেলেছেন ৭১ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুর্দান্ত শুরুর পরও সে বছর তার ব্যাটিং গড় ২১.৬৭। তার গোটা ক্যারীয়ারের চিত্রনাট্য যেন লেখা হয়ে যায় ওই বছরই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ৯৮ রানের ইনিংস খেললেও তাই বাজে ফর্মের দরুন বাদ পরাটাই ছিল নিয়তি। আইসিসি নক আউট বিশ্বকাপে অমন দারুণ কিছু মুহূর্ত উপহার দেওয়ার পর যখন দলে জায়গা পাকা করার কথা তখন পরের সিরিজগুলোয় বাজে খেলে তাকে নামতে হলো দলে জায়গা ফিরে পাওয়ার সংগ্রামে। অবশেষে ফিরেছিলেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে,ফিরেই জোড়া ফিফটি। এবারও যখন সাংবাদিকরা লিখতে বসলেন, 'যুবরাজ ফিরলেন রাজার মতোই '। তবে ভারতের পরবর্তী প্রতিপক্ষ ছিল ওয়েস্টইন্ডিজ। সে সিরিজে যুবরাজের গড় ছিল ৫.৫০। তার পরপরই সে এসে হাজির ২০০২ সালের গ্রীষ্মের সেই লর্ডস। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের ৩২৬ রান তাড়া করা সেই ম্যাচে যুবরাজ সিং খেলেছিলেন ৬৯ রানের ইনিংস। ভারত জিতেছিল ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের শিরোপা। ২০০২ সালের ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচে অপরাজিত ৬৪ রানের  ইনিংস খেলেও যা হয়নি, এ ম্যাচে অবশ্য তা হলো। দলে যুবরাজ সিং এর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সমস্ত প্রশ্নই উড়ে গেল। এই পারফরম্যান্সের পুরুষ্কারই যেন পেয়েছিলেন টেস্ট দলে ডাক পেয়ে। তার মতো স্টোক প্লেয়ারদের ক্রিকেটের অভিজাত ফর্মেটটা ঠিক মনে ধরবার কথা নয়। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, যদিওবা তার মনে ধরেছিল কিন্তু তার ব্যাটে ধরেনি। তাই ২০০৩ সালের শেষভাগে অভিষেক হবার পরও ২০১২ অব্দি টেস্ট খেলেছিলেন মোট ৪০ টি। এই সময়কালে ভারতের খেলা মাত্র ৩৮.৮৩ শতাংশ। গড়টাও বড্ড সাদামাটা মাত্র ৩৩.৯৩ সেঞ্চুরি ৩টি। তবে তাতে তার ওয়ানডে ক্রিকেটে ভাঁটা পড়ে নি। ২০০৪ সালে অজিদের মাটিতে ওদের বিপক্ষেই সেঞ্চুরিটা এসেছিল ব্যাটের কানায় লেগে। আর বাকি সময়টায় একের পর এক সুইপ-পুল-ড্রাইভে লি-গিলেস্প-সাইমন্ডসদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলে নিয়েছিলেন ১৩৯ রান, বল করেছিলেন ১২২ টি। রানের চেয়ে রান করার ধরনের কারণে এসেছিলেন আলোচনায়। এতোটা আয়েসি ভঙ্গিতে চার ছক্কার মার বিস্ময় জাগায়। এরপর আবার শীতনিদ্রা আবারও কিছু হাফ সেঞ্চুরি আবার কিছুটা ব্যার্থতা। তবে এত কিছুর মধ্যে ধ্রুব সত্য তার ছোঁয়ায় ভারতীয় ওয়ানডে দলের বদলে যাওয়া। পরিসংখ্যানের আশ্রয় নিয়ে জানা যায়, যুবরাজের ক্যারিয়ারের প্রথম ১৪ হাফ সেঞ্চুরির ১৩ টিতে জয়ী দলের নাম ভারত। ভারতীয় ক্রিকেট দলের বদলে যাওয়া কারিগর হিসেবে যুবরাজকে তাই দাড় করানোই যায়। ২০০৭ সালে টি-২০ ক্রিকেটের আবির্ভাব। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ছয় ছক্কার ওভার, ১২ বলে ফিফটি। ৩৬২ স্ট্রাইক রেটে ইনিংসেতো যুবরাজের ক্যারিয়ারে হাইলাইট হয়ে থাকবে। আহা স্টুয়ার্ট ব্রড বেচারাকে কি মারটাই না দিয়েছিলেন সেদিন। তবে টি-২০ ক্রিকেটে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেন প্রিয় প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩০ বলে ৭০ রানের ইনিংস খেলে। ভারতও উঠেছিল ফাইনালে। অনেকের চোখে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস এটি। এর আগে ২০০৭ সালে সহ-অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন কিছু দিন। কিন্তু গোটা ক্যারিয়ারে অধারাবাহিক ফর্মের দরুন তা হারিয়ে ফেলেছিলো তাড়াতাড়ি। নিজদেশে অনুষ্ঠিত ২০১১ বিশ্বকাপের আগে পড়েছিলেন চূড়ান্ত বাজে ফর্মে। ২০১০ সালে খেলা ১৪ ইনিংসে ফিফটি মোটে ২ টি। সেই ফিফটি দুটিও ঠিক যুবরাজ শুলভ নয়। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে যাওয়া ছিল অনিশ্চিত। দুয়ারে দাঁড়িয়ে রোহিত শর্মার মতো তরুণেরা। ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ধোনি। তার অনুরোধে যুবরাজকে নির্বাচকেরা নিয়েছিলেন বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। বিশ্বকাপে খেলা ৭ ম্যাচে ৩১৩ রান, সাথে কার্যকরি ইনিংসে ১৫ উইকেট, বিশ্বকাপে এমন অলরাউন্ড নৈপুণ্যে  তার আগে করতে পারে নি কোন খেলোয়াড়ই। যদিও সম্প্রতি ২০১৯ বিশ্বকাপে সাকিব ও কৃতিত্ব করে দেখিয়েছেন। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ম্যান অব দ্যা টুর্নামেন্ট হওয়ার পর সিনিয়রদের বিশ্বকাপেও ম্যান অব দ্যা টুর্নামেন্ট এই কৃতিত্ব বা কয়জনের আছে। এর কৃতিত্ব আরো বেড়ে যায় যখন জানা যায় পুরো টুর্নামেন্ট খেলেছিলেন ক্যান্সারকে সঙ্গে নিয়ে। ২০১১ এর বিশ্বকাপের পর ফর্মের লুকোচুরির কারণে দলে আর নিয়মিত হয়ে ওঠা হয় নি কারণ ভারত দলে যে এ রকম যুবরাজের ছড়াছড়ি যারা কিনা বলের সাথে পাল্লা দিয়ে রান তুলতে সক্ষম। সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছেন ২০১৭ সালে। তার মাঝে খেলেছেন মোট ৩০৪ টি একদিনের ম্যাচ। তাতে ১৪ শতকে করছেন ৮৭০০ রান। বল হাতে শিকার করেছেন ১১১ উইকেট। টি-২০ তে ৫৮ ম্যাচে ১৭০০ রান ও ২৮ উইকেট। শেষপর্যন্ত কিছুদিন আগে রাগে সব ফর্মেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন যুবরাজ। ব্যাক্তিগত জীবনে যুবরাজের স্ত্রী হলিউড অভিনেত্রী  হ্যাজেল কিজ। দীর্ঘদিন প্রেমের পর ২০১৬ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন এ দম্পতি।

বার্তা জগৎ২৪/ এম এ