চামড়া শিল্পে বরাদ্দকৃত ৭শ’ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ গেলো কোথায়?

বার্তা‌জগৎ২৪ ডেস্কঃ

প্রকাশিতঃ ১৬ অগাস্ট ২০১৯ সময়ঃ বিকেল ৫ঃ৪০
চামড়া শিল্পে বরাদ্দকৃত ৭শ’ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ গেলো কোথায়?
চামড়া শিল্পে বরাদ্দকৃত ৭শ’ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ গেলো কোথায়?

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্কঃ

এবার নষ্ট হওয়া গরুর চামড়া থেকে রফতানি আয় কমবে প্রায় ৩৮৯ কোটি টাকা। এছাড়া ছাগলের চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০০ টাকার বেশি রফতানি মূল্য রয়েছে। সে হিসাবে ছাগলের চামড়া থেকে আয় কমবে কমপক্ষে দেড়শ’ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, গরু-ছাগলের চামড়া নষ্ট হওয়ায় সব মিলে কমপক্ষে সাড়ে পাঁচশ’ কোটি টাকার রফতানি আয় কমে যেতে পারে।

দুই সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কোরবানির পশুর চামড়ার ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে। এমন দাবি করেছে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন।

দেশের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ হয় কোরবানির ঈদে। এ বছর কমপক্ষে ১ কোটি ১৮ লাখ পশুর চামড়া কেনা-বেচা হওয়ার কথা। এর মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৮২ হাজার এবং ছাগল-ভেড়া ৭২ লাখ। এছাড়া ৬,৫৬৩ টি অন্য পশু। পোস্তার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিএইচএসএমএর হিসাব মতে ৩০ শতাংশ চামড়া এ বছর নষ্ট হয়েছে। এর অর্ধেকই গরুর চামড়া। একটি গরুর চামড়া (গড়ে ১৮ বর্গফুট) বিদেশে রফতানি করে আয় হয় সর্বনিম্ন ২১৬০ টাকা।

এদিকে সারা দেশে চামড়ার মূল্য বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে মাঠে নেমেছে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে সরকারকে প্রতিবেদন দেবে। এরপর সরকারি ভাবে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। কারণ এ বছর ৭শ’ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ দেয়া হয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ে তারল্য সংকট থাকার কথা নয়।

কোরবানির পশুর সংখ্যা বাড়লেও চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কেন কমানো হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি কেউ। সংস্থাটির তথ্য মতে, দেশে এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে অন্তত ১ কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি হতে পারে বলে ধারণা করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। অন্যদিকে, গত বছর ঈদে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ। এর মধ্যে ১ কোটি ৫ লাখের মতো পশু কোরবানি হয়েছিল।

বিপুলসংখ্যক এ চামড়া রাস্তায় ফেলে, নদীতে ভাসিয়ে ও মাটির নিচে চাপা দেয়া হয়। কাঁচামাল হিসেবে এসব চামড়া ট্যানারিগুলোতে আসত। নষ্ট চামড়াগুলো যথাসময়ে কেনা সম্ভব হলে বিদেশে রফতানি করে সাড়ে পাঁচশ’ কোটি টাকা আয় হতো। কিন্তু এবার তা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন এ খাতের সঙ্গে জড়িতরা।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মফিজুল ইসলাম বলেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ। এটি মাটিতে পুঁতে ফেলা, রাস্তায় বা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া গর্হিত কাজ। এ ধরনের কাজ যারা করেছেন, তারা ঠিক করেননি। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা বলছি। নিশ্চয়ই সামনে এ নিয়ে আর কোনো সমস্যা হবে না। কাঁচা চামড়া রফতানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমে ওয়েট ব্ল– রফতানি এবং পরে লবণযুক্ত চামড়া রফতানির অনুমোদন দেয়া হবে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি খাতে আয় ৯ হাজার ২৯১ কোটি টাকা (১০৯.৩০ কোটি মার্কিন ডলার)। ধারণা করা হচ্ছে, কাঁচামাল সংকটের কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না।

এদিকে চামড়া বাজারের বিপর্যয় দেখে বুধবার বিকালে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মফিজুল ইসলাম জরুরি বৈঠক করেন। সচিব, ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি শাহীন আহমেদকে সচিবালয়ে ডেকে আনেন। কাঁচা চামড়া কেনার বিষয়ে দাম ও সময় নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বৈঠকে আড়তদারদের কাছ থেকে শনিবার থেকে চামড়া কেনার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও আগে ট্যানারি শিল্পের মালিকরা ঘোষণা দিয়েছিলেন ২০ আগস্ট অর্থাৎ মঙ্গলবার থেকে চামড়া কেনা শুরু করবেন।

এদিকে কোরবানির পশুর চামড়ার সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার হচ্ছে পুরান ঢাকার পোস্তা। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, পোস্তার ব্যবসায়ীরা (আড়তদার) কোরবানি উপলক্ষে ৩৫ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত আড়তদারদের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। পোস্তার ব্যবসায়ীদের মতে, চিরচেনা সেই পোস্তার চরিত্র এবার দেখা যায়নি। সাধারণত কোরবানির ঈদের দিন দুপুর থেকে পুরান ঢাকার পোস্তায় প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এ বছর ছিল তার উল্টো চিত্র। পাইকাররা খুব কম সংখ্যক চামড়া পোস্তায় নিয়ে এসেছেন। মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে গাড়ি বোঝাই করে পোস্তায় না এনে রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন।

পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো খতিয়ে দেখবে তাদের দেয়া ঋণের অর্থ ট্যানারি মালিকরা সঠিকভাবে ব্যবহার করেছেন কিনা। কারণ এ চামড়া কেনার জন্য এ বছর ব্যাংকগুলো ৭শ’ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনার জন্য তারল্য সংকট থাকার কথা নয়। আড়তদারদের বকেয়া পরিশোধ হওয়ার কথা। কিন্তু আড়তদারদের হিসাবে দেড়শ’ সক্রিয় কারখানার মধ্যে মাত্র ৩টি কারখানা একশ’ শতাংশ, ৭টি কারখানা ৫ থেকে ৫০ শতাংশ বকেয়া পরিশোধ করেছে। বাকি ১৪০টি কারখানা কোনো বকেয়া পরিশোধ করেনি। যে কারণে পাইকাররা ভয়াবহ তারল্য সংকটে পড়ে চামড়া কিনতে পারেননি।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রায় ৬০ লাখ পিস চামড়া এখনও অবিক্রীত রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে এবারের প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ পিস চামড়া। এ বাড়তি চামড়ার সংরক্ষণ নিয়েই এবার দুশ্চিন্তায় আছেন ট্যানারি মালিকরা। সংগঠনটির মতে, বছরে গড়ে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪.৮৩ শতাংশ গরুর চামড়া, ৩১.৮২ শতাংশ ছাগলের, ২.২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১.২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া।

বিটিএ সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, গতবারের চামড়া মজুত বেশি থাকায় আমরা এবার কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছি। সামনেই চামড়ার সবচেয়ে বড় জোগান আসবে। তখন বাড়তি চামড়া সংরক্ষণে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হবে। এ কারণেই এবার চামড়া ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারেও চামড়ার দাম কমেছে। আমরা চামড়ার দাম কমাতে বলেছিলাম। গত বছরের মতো দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রভাব বাজারে পড়বেই।

কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. হাজী দেলোয়ার হোসেন বলেন, এ বছর আমরা ১ কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি। গত বছরের চেয়ে এবার আমাদের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কম। এর প্রধান কারণ গত বছরের চামড়া মজুত আছে। তা ছাড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে গত বছরের ৩৫০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে আড়তদারদের। এ অবস্থার মধ্যে বেশি চামড়া কিনে ঝুঁকি নিতে চাইবেন না আড়তদাররা।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস, ফুটওয়্যার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন মাহিন বলেন, চামড়ার দূষণ বন্ধ না হওয়ায় রপ্তানির বাজার হারাতে হচ্ছে। এ কারণে এখন ৬০ শতাংশ চামড়া মজুদ রয়েছে। এবারও একই পরিস্থিতি হলে শুধু বর্জ্য দুরবস্থা নয়, পুরো চামড়া খাতে বিপর্যয় আসবে।

বার্তা‌জগৎ২৪.কম/এফ এইচ পি