জন্ম দেওয়ার কারণে মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করার গল্প- ‘ক্যাফার্নাউম’

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিতঃ ১৪ মার্চ ২০১৯ সময়ঃ সন্ধ্যা ৭ঃ০০
জন্ম দেওয়ার কারণে মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করার গল্প- ‘ক্যাফার্নাউম’
জন্ম দেওয়ার কারণে মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করার গল্প- ‘ক্যাফার্নাউম’

১৯৫০-র দশকে চলচ্চিত্রে পরিচিতি পাওয়া নব্য-বাস্তবতাবাদ ফিরে এসেছে ২০১৮-তে। লেবানিজ চলচ্চিত্র ‘ক্যাফার্নাউম’ তেমনি একটি আধেয়। ‘ক্যাপার্নাউম’ শব্দটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘বিশৃঙ্খলা’। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পরিচালক নাদিন লাবাকি জেইন নামের ১২ বছরের এক বালকের জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন। জেইন হল গল্পটির প্রধান চরিত্র।

                    

চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায় একজন ডাক্তার একটি বালকের দাঁত পরীক্ষা করে জানাচ্ছেন যে সে কোন দুধ দাঁতের অধিকারী নয় এবং তার বয়স বারো বছরের মতো। প্রারম্ভের এই দৃশ্য দেখেই বোঝা যায়, চলচ্চিত্রটি প্রামাণ্যচিত্র ভিত্তিক ড্রামা। চলচ্চিত্রটিতে কয়েকটা গ্রুপের জীবন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এবং দেখানো হয়েছে, বৈরুতের দারিদ্যপীড়িত জীবনে শিশু, নারী, অভিবাসী শ্রমিক কতটা ঝুঁকিগ্রস্ত। নয়া-বাস্তবতাবাদ যুগের মতো করে পরিচালক চরিত্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্টতাকে প্রাধান্য দিয়ে সিরিয়ান উদ্বাস্তু শিবির থেকে জেইন নামক চরিত্রটি নির্ধারণ করেন। সিনেমার শুরুতেই দেখা যায়, আদালতের একটি দৃশ্য। যেখানে জন্ম দেওয়ার কারণে জেইন তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করে। গল্পের বয়ানটি সরলরৈখিক নয়। ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে এর কারণ ও গল্পের বয়ান দৃশ্যায়িত হয়।

যেখানে দেখা যায়, জেইনের পরিবার বৈরুত শহরে একটি ঘিঞ্জি পরিবেশে ছোট ফ্ল্যাটে গাদাগাদি করে থাকে। জেইন তার পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করার জন্য স্কুলে না গিয়ে কাজে লিপ্ত থাকে। পরিবার থেকে তৈরি করা জুস বিক্রি, দোকানে কাজ করা, মজুর খাটা, মাদক ব্যবসা এইগুলো তার নিত্যদিনের কাজ। জেইনকে বয়সের তুলনায় একটু বেশি দায়িত্বশীল বলে মনে হয়েছে। পরিবারে তার সবথেকে ঘনিষ্ট সদস্য বোন, সাহার। অল্প বয়সে সাহারের বিয়ে দাওয়ার প্রতিবাদে সে নিষ্ঠুর বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে।

কোনভাবেই ঠেকাতে না পেরে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে অন্য শহরে চলে যায়। সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় রাহিল নামের এক ইথিওপিয়ান অভিবাসী নারী শ্রমিকের সাথে। রাহিল তার ছেলে সন্তান ইউনাসকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য জেইনকে বাসায় নিয়ে যায়। কিন্তু অবৈধ অভিবাসী হওয়ায় ইতোমধ্যে ইউনাসকে নিয়ে ঘোরতর বিপদে পড়ে জেইন। পরে সে ম্যাসুনের মাধ্যমে এস্প্রো নামের এক দালালের সাথে পরিচিত হয়। যে তাদের সুইডেনে প্রেরণের আশ্বাস দেয়।

জেইন ইউনাসকে এস্প্রোর কাছে দিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজ নেওয়ার জন্য নিজের বাসায় ফিরে এসে জানতে পারে অল্প বয়সে গর্ভধারণ করার কারণে তার বোন সাহার মারা গিয়েছে। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে সে সাহারের স্বামী আসাদকে ছুরিকাঘাতে আহত করে। ফলে তার ৫ বছরের জেল হয়। জেলে থাকা অবস্থায় টেলিভিশনে প্রচারিত লাইভ রিয়েলিটি শো-তে সে তার কষ্টের কাহিনী বলার মাধ্যমে জন্ম দেওয়ার কারণে মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করে।

চলচ্চিত্রটিতে বাস্তবতাকে তুলে ধরার কারণে এটি ডকু-ড্রামাতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তারপরও ২ ঘন্টার চলচ্চিত্রটি ছিল টান টান উত্তেজনার মধ্যে। দৃশ্যায়নের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে, সিনেমাটোগ্রাফার দৃশ্যকে অধিকতর জীবন্ত করার জন্য ক্যামেরাকে গতিশীল রেখেছে। মাঝে মাঝে কিছু এরিয়াল শটের মাধ্যমে পুরো শহরকে দৃশ্যায়িত করা হয় এবং বৈচিত্রময়তার জন্য দৃশ্যায়নে ক্যামেরা ধারণটা ছিল এক্সপেরিমেন্টাল। সম্পাদনার কাজটিও ছিল উন্নত মানের। 

চলচ্চিত্রটিতে গল্পটা জেইনের হলেও আমরা পাশাপাশি দেখতে পাই এমন একটি সমাজে নারীর সমস্যাগুলো। সেক্ষেত্রে জেইনের মা, বোন (সাহার), অভিবাসী শ্রমিক (রাহিল)-এর পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক অবস্থান পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি সমাজ ব্যবস্থার অপরাধ প্রবণতাটাও আকর্ষণের জায়গা হিসাবে প্রতীয়মান। মাদক ব্যবসা এবং নারী ও শিশু পাচারের মতো অপরাধগুলোও ধরা দিয়েছে।

বিশেষ করে জেইন চরিত্রটিকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ দুটি চরিত্রের সাথে মেলাতে পারি। দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে ভিত্তেরিও দে সিকার ‘বাই সাইকেল থিভস’ এর ‘ব্রুনো রিচ্চি’ এবং পারিবারিক অসঙ্গতির কারণে বাড়ি থেকে পালানো ফ্র্যাসোয়া ত্রুফোর ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’-র ‘এন্টোনি দোয়ানেল’ চরিত্রের সাথে। সর্বোপরি বলা যায়, বাস্তব জীবনই ‘ক্যাফার্নাউম’-র অনুমিত লক্ষ্য।

লেখকঃ সায়েম খান, চলচ্চিত্র আলোচক।

বার্তাজগৎ২৪/ এ কে