জীবনঘনিষ্টতা নিয়ে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবি জীবনানন্দ

বার্তা জগৎ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ২৮ এপ্রিল ২০১৯ সময়ঃ রাত ২ঃ২১
জীবনঘনিষ্টতা নিয়ে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবি জীবনানন্দ
জীবনঘনিষ্টতা নিয়ে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবি জীবনানন্দ

 

বার্তা জগৎ২৪ ডেস্কঃ

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লিখতে গিয়ে বার বার থেমে যাচ্ছে কলম। কবির কবিতা ও তার উত্তরাধিকার বহনকারী হিসাবে আমাদের দায়বদ্ধতা, এইগুলো ভাবতে গেলে খেই হারিয়ে ফেলি। কোথা থেকে শুরু করবো আর কোথায় শেষ করবো, সেটা বুঝে ওঠাই মুশকিল। বাংলা সাহিত্যের জগতে মেঘে ঢাকা অন্যতম প্রজ্জ্বলিত নক্ষত্রটি জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দ দাশের গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ প্রভৃতি থাকলেও তিনি মূলত কবি হিসাবে স্বীকৃত। ষাটের দশকে, বিশেষ করে মৃত্যুর পর জীবনানন্দ স্বীকৃতি পেয়েছেন। পেয়েছেন ভূয়সী প্রশংসা। এরপর কেউ কেউ অবশ্য দাবি করে বসেন যে, জীবনানন্দ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি। যে কবি তার মৃত্যুর পর এতো স্বীকৃতি পেলেন, জীবদ্দশায় কেন পেলেন না? জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরে স্বীকৃতির এতটা বিস্তর ফারাক আর কোন সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে ঘটেছে কিনা সন্দেহ।

 

বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতায় দশক বিভাগ একটি অনন্য ঘটনা। পৃথিবীর আর কোন সাহিত্যে এই রকম দশক বিভাগ আছে কিনা সন্দেহ। দশকের ভিত্তিতে এই ভাগ কবিতার ক্ষেত্রে কতটুকু বিবেচ্য সেটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। কিন্তু এতে যে রাজনীতি রয়েছে সেটা বোঝার জন্য সাহিত্যবোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই, সাহিত্য পিপাসু পাঠকমাত্রই বুঝে। যেমন- রবীন্দ্রনাথের সময় বাংলা কবিতায় রবীন্দ্র ধারার বিপরীতে গিয়ে আমাদের ত্রিশের দশকের কবিদের উত্থান। মোটা দাগে ত্রিশের দশকের কবিদের কবিতায় ভিক্টোরিয়ান প্রভাব লক্ষণীয় হলেও জীবনানন্দের কবিতায় একটি স্বতন্ত্র ধারা, যার মধ্যে এখানকার জীবনধারা বা প্রকৃতির চিত্রকল্প ধরা দিয়েছে।

 

কবিদের ঘিরে স্কুল প্রতিষ্ঠা হলেও জীবনানন্দ কোন স্কুলে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই কবিদের কোন স্কুলে তিনি যোগদান করেন নি। কবি সত্তার ভিতরে একটি সৃষ্টিশীল বিষয় লুকিয়ে থাকে জীবনানন্দ আপন ভুবনে সেই স্রষ্টা। শুধুমাত্র নামের ক্ষেত্রেই তিনি জীবন সম্পর্কিত নন। তিনি কর্মেও ছিলেন জীবন সংশ্লিষ্ট। তাঁর কবিতার মধ্যে জীবনের চরম বাস্তবতা নিহিত। তিনি দুঃখ নামক সাগর সেঁচে তুলে এনেছেন জীবন নামক মুক্তা। দুঃখ, ক্লেদ, অবসাদগ্রস্ততাকে না এড়িয়ে, সেগুলো থেকে নির্যাস নিয়ে কবিতাকে করেছেন প্রাচুর্যময়। এজন্য কেউ কেউ তাকে নৈরাশ্যবাদী বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন পলায়নপর, প্রতিক্রিয়াশীল। আবার কেউ বলেছেন ছদ্মবেশী। মূল বিষয় হল এরা কেউই তাকে সম্পূর্ণভাবে পড়তে পেরেছেন বলে মনে হয় না। সমস্যাটা কোথায় সেটা চিহ্নিত নয়। সমস্যাটা কি কালের ছিল, না কালের মানুষগুলোর? কারণ জীবনানন্দ দাশ তাঁর মৃত্যুর পর এতটাই প্রস্ফুটিত হলেন যে বাংলা সাহিত্যের দিগন্তে কালজয়ী অপরাজেয় কবি হিসাবে তাঁর উদয়।

 

আর তাঁর এই উদয় নিয়ে তিনিও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তার প্রমাণ আমরা পাই হুমায়ন কবিরকে লেখা তাঁর একটা চিঠিতে। সেখানে তিনি লিখেছেন-

প্রিয় কবির সাহেব,

‘আমি বিশিষ্ট বাঙালিদের মধ্যে পড়ি না; আমার বিশ্বাস জীবিত মহত্তর বাঙালিদের প্রশ্রয় পাওয়ার মতনও কেউ নই আমি। কিন্তু আমি সেই মানুষ, যে প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রতিটি দ্রব্যকে সনা বানিয়ে তুলতে চায় অথবা মহৎ কিছু- যা শেষ বিচারে কোন একটা জিনিসের-মতন-জিনিস কিন্তু ভাগ্য এমনই যে, তার খাদ্য জুটছে না। কিন্তু আশা করি, ভবিষ্যতে খাঁটি মূল্যের যথার্থ ও উপযুক্ত বিচার হবে। আমার ভয় হয়, সেই ভালো দিন দেখতে আমি বেঁচে থাকবো না’।

 

এটাই কবির ব্যতিক্রমী গুণ। ভবিষ্যৎ-কে দেখতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা। আর সেটা অনন্য হয়ে যায় যখন জীবনঘনিষ্টতা নিয়ে কবি হয়ে যান ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। যারা জীবদ্দশায় অর্থকষ্টে জীবনানন্দের পাশে থাকেন নি, এমনকি কেউ কেউ তাকে কবি হিসাবে স্বীকৃতি দিতে চান নি। তারাই পরবর্তীতে জীবনানন্দে কবিতার ভুয়সী প্রশংসা করেছেন। তাকে পুরস্কৃতও করেছেন। কিন্তু পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতার কারণে অন্তর্মুখী কবিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে বাংলা সাহিত্যের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা কি আর ঘুচবে!

লেখকঃ মৃত নক্ষত্র (ছদ্মনাম) 

সাহিত্য সমালোচক।