দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস

আখিউজ্জামান মেনন

প্রকাশিতঃ ১৭ জুলাই ২০১৮ সময়ঃ রাত ৩ঃ১৪
দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস
দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস

 

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ THE MINISTRY OF UTMOST HAPPINESS, ARUNDHATI ROY

'How to tell a shattered story?
By slowly becoming everybody.
No.
By slowly becoming everything.'

- ARUNDHATI ROY, THE MINISTRY OF UTMOST HAPPINESS

সে ছিল পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ। দাই আহলাম বাজি (Ahlam Baji) তাকে তার মায়ের কোলে দিয়ে বলে, 'ছেলে'।

জাহানারা বেগম আর তার স্বামী আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল- ছেলে হলে তার নাম রাখবে আফতাব।
পরদিন ভোরে জাহানারা বেগম সন্তানের সমগ্র শরীর পরীক্ষা করে দেখে- খুদে চোখ, খুদে নাক- তার চোখ পরিতৃপ্তিতে ভোরে ওঠে। শুধুমাত্র খানিকটা সময় পরিতৃপ্তি টিকে থাকে। তারপর অরুন্ধতী পাঠকের কাছে প্রশ্ন করে- Is it possible for a mother to be terrified of her own baby?

জাহানারা বেগম আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল- সন্তান তার হিজড়া বুঝতে পেরে।

আফতাব একসময় হয়ে যায় আনজুম। আশ্রয় নেয় হিজড়াদের আবাসস্থল 'Khwabgah' তে (স্বপ্ন-ঘর)। শাহজাহানাবাদে তারপর ঘটনা এগিয়ে যায়। হিজড়াদের জীবন, দর্শন, ভাবনা বর্ণনায় জায়গা করে নেয়।

জামে মসজিদের সম্মুখে রাস্তায় পড়ে থাকা একটা বাচ্চাকে কোলে তুলে নেয় আনজুম। নিয়ে আসে স্বপ্ন-ঘরে। যয়নব নাম নিয়ে বেড়ে ওঠা বাচ্চাকে ঘিরে আনজুমের জীবন আবর্তিত হয়।

যয়নবের দীর্ঘকালীন কাশি দেখা দিলে আনজুম আজমেরে হযরত গরিব নেওয়াজের মাজারে রোগ মুক্তির আবেদন নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মাজার-ভ্রমণে তার সঙ্গী হয় ফুলের দোকানদার সত্তরোর্ধ জাকির মিয়া।

তারা আজমের যিয়ারত শেষে আহমেদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। যেখানে জাকির মিয়ার কিছু কাজ থাকে।

এই সময় গুজরাটে একটা ট্রেনে আগুন লাগানো হয়। আগুনে পুড়ে মারা যায় ৬০ জন হিন্দু তীর্থযাত্রী। গুজরাটে বয়ে যায় রক্তের বন্যা। মুসলমানেরা মারা পড়তে থাকে।
আনজুম চোখের সামনে দেখতে পায় জাকির মিয়ার হত্যাকান্ড, সে নিজে বেঁচে যায় হিজড়া বলে।

স্বপ্ন-ঘরে ফিরে এসে আনজুম উন্মাদনায় ভুগতে শুরু করে। গুজরাটের বিভীষিকাময় স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। যয়নব তাকে ভয় পেতে শুরু করে। ভীতির দরুন একরাতে যয়নব আনজুমের ঘর ছেড়ে অন্য ঘরে ঘুমাতে যায়। এই ঘটনা আনজুমকে তীব্রভাবে আঘাত করে। সে স্বপ্ন-ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আশ্রয় নেয় পুরাতন একটা কবরস্থানে। এই কবরস্থানেই- পরবর্তীতে জান্নাত গেস্ট হাউজ নামে পরিচিত হয়ে ওঠা- একসময় গড়ে ওঠে দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস।

সমগ্র উপন্যাস জুড়ে লেগে আছে রক্তের গন্ধ। ৪৭ এর দেশভাগ, ৮৪ এর শিখনিধন, গুজরাটে দাঙ্গা একে একে জায়গা করে নেয় পাতায় পাতায়।

কাশ্মীর বড় একটা জায়গা দখল করে আছে এই উপন্যাসে। কাশ্মীরের মিলিট্যান্ট মুসা ও কেরালার তিলোত্তমার ভালবাসা এসেছে চমকপ্রদ বর্ণনায়।

তিলোত্তমা চরিত্র রচনায় অরুন্ধতী সম্ভবত সেমি-অটোবায়োগ্রাফির সাহায্য নিয়েছেন।

অবশ্য পুরো উপন্যাসটাই হয়তো অরুন্ধতীর সেমি-অটোবায়োগ্রাফি। কারণ অরুন্ধতী রায় কাশ্মীর প্রসঙ্গে ২০০৮ সালে টাইমস ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিল সে কাশ্মীরের স্বাধীনতা দেখতে চায়।

দ্য মিনিস্টি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেসে তাঁর চাওয়ার প্রকাশ ঘটেছে ভীষণ তীব্রভাবে।

নন লিনিয়ার বর্ণনায় তিলোত্তমা, মুসা, গার্সন হোবার্ট (Garson Hobart), নাগার (Naga) কাহিনী ব্যক্ত করা হয়েছে।

আরো এসেছে- খুনি অমরিক সিংয়ের ( Amrik Singh) নৃশংসতা, মাওইস্ট রেভাথির ( Revathy) চিঠি। চিঠি থেকে তাঁর উপর চালানো নির্মম নির্যাতন, ধর্ষণ সম্পর্কে জানা যায়। ধর্ষণ থেকে গর্ভবতী হয়ে পড়া রেভাথি একসময় জন্ম দেয় উদয়াকে ( Udaya) যাকে সে দিল্লির যন্তর মন্তরে ফেলে যায়। যন্তর মন্তরে তখন দুর্নীতিমুক্ত ভারত গঠনের স্বপ্ন নিয়ে আমরণ অনশনে নামে একজন গান্ধীবাদী। শিল্পপতিরা গান্ধীবাদীকে বড় অঙ্কের টাকা দান করে। এবং সে তা খুশি চিত্তে তা গ্রহণ করে।

২০১১ সালে Anna Hazare যখন তাঁর হাঙ্গার স্ট্রাইক নিয়ে বেশ জনপ্রিয় ঠিক তখনই অরুন্ধতী রায় তাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছিল যন্তর মন্তরে গড়ে ওঠা আন্দোলনের উদ্দেশ্যর স্বচ্ছতা নিয়ে।

যন্তর মন্তরে রেভাথির রেখে যাওয়া উদয়াকে নিয়ে আসে তিলোত্তমা। মুসার মৃত কন্যার নামে নাম রাখে- মিস জেবিন দ্যা সেকেন্ড।

জেবিন দ্য সেকেন্ডকে নিয়ে তিলোত্তমা বসত গড়ে আনজুমের জান্নাত গেস্ট হাউজে।

রেভাথির পাঠানো চিঠিতে মিস জেবিন দ্য সেকেন্ডের মাতৃ-প্রদত্ত নাম উদয়া জানতে পেরে জান্নাত গেস্ট হাউজের সদস্যরা তার পুরো নাম ঠিক করে, মিস উদয়া জেবিন।

অরুন্ধতী রায় তাঁর উপন্যাস শেষ করেছেন-
... things would turn out all right in the end- আশাবাদ রেখে। আশাবাদী হওয়ার কারণ হিশেবে দেখিয়েছেন-
Because Miss Jebeen, Miss Udaya Jebeen was come.

সারা জীবন রক্ত-যুদ্ধ, অত্যাচার, অন্যায়, বিভীষিকা দেখতে পাওয়া একদল মানুষ একটা কবরস্থানে খুঁজে পায় আটমোস্ট হ্যাপিনেস। এই কবরস্থানে আরো জায়গা করে নেয়- সারাদিন ঘুমিয়ে দিন কাটানো গরু, উড়তে না-পারা ময়ুর, পরিত্যক্ত কাছিম, মহেশ নাম পাওয়া গাধা; বিড়াল, ঘোড়া, কুকুর, গুবরেপোকা- অরুন্ধতী রায়কে তখন দেখতে পাই এনার্কো প্রিমিটিভিজমে বিশ্বাসী একজন মানুষ হিশেবে।

ন্যারেটিভের বহু জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে ফ্ল্যাশফরোয়ার্ড যা উপন্যাসে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। চ্যাপ্টার সাত এর শুরুতে পাঠকের কাছে রেখে যাওয়া প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন চ্যাপ্টার ১০ এ এসে। জায়গায় জায়গায় ফিকশনাল ও নন-ফিকশনাল ন্যারেটিভের বিভেদরেখা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কাশ্মীরি-ইংরেজি এলফাবেট হেডিংয়ের আওতায় উল্লেখ করা শব্দগুলা দিয়ে হয়তো দেখাতে চেয়েছেন কাশ্মীরে বসবাস করা মানুষদের ভাষার ও ভাবনার জগৎ। একটা নিউজ তুলে দিয়ে শেষে উল্লেখ করেছেন একটা এম,সি,কিউ-

Tick the Box:
Q 1: Why did the cattle cross the LoC?
(a) For training
(b) For sneak-in ops
(c) Neither of the above

এ-জাতীয় বিভিন্ন উপাদান উপন্যাসের বর্ণনাকে জাদুময় করে তুলেছে। পরাবাস্তবতা, জাদু বাস্তবতায় মিশে গেছে অনেক জায়গায়। মেটা ফিকশনাল ন্যারেটিভে আশ্রয় পেয়েছে এবসার্ড ফিলোসফি।
নব্য সাম্রাজ্যবাদের অস্ত্র ভাষাকে ভাষা দিয়ে আক্রমণ করেছেন। আবেগ প্রকাশের নিরপেক্ষতায় প্রায়ই বেছে নিয়েছেন অপরিচিত শব্দ। এরই সাথে ছিল বহু কবিতার ব্যবহার।

উপন্যাসের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই নগরায়ন এবং শিল্পায়নকে আঘাত করেছেন বেশ অনেক স্থানে। এরই সাথে এসেছে খেটে খাওয়া মানুষদের বঞ্চনা, আদিবাসী সংগ্রাম।

সবকিছুর মূলে হয়তো তিনি দেখাতে চেয়েছেন রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলকারীদের ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষার দরুন কিভাবে মানুষের ইতিহাস রক্তের ইতিহাস হয়ে ওঠে। মানুষে-মানুষে দ্বন্দ্ব তৈরিতে জাতি, গোত্র, ধর্ম,দেশ,ভাষা কিভাবে ব্যবহৃত হয়।

৪৪৫ পৃষ্টার এই উপন্যাসকে আমি ভেবেছি বহু বছরের ভারতের নির্যাতিত মানুষদের টিকে গিয়ে বেঁচে থাকার ইতিহাস। অথবা হয়তো, অরুন্ধতী রায়ের চিন্তার কোন কিছুই বুঝে উঠতে সক্ষম হতে পারিনি জ্ঞান ও যোগ্যতার অভাব থাকায়।

আমি বেশ ভালো রকম মৃত্যু-আকাঙ্ক্ষী একজন মানুষ। সেই ছোটবেলা থেকেই।
তবে মাঝেমাঝে ভীষণ বাঁচতে ইচ্ছা করে। এই উপন্যাসটা পড়তে গিয়ে যেমন করেছে। পড়ার সময়টাতে মৃত্যুকে বারবার বলেছি, Not today ( ডায়ালগটা গেম অফ থ্রোন্স থেকে ধার করা), Not today.

Share on: