নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনুপম আঁধারে ঘেরা রাঙ্গামাটি জেলা

বার্তা জগৎ২৪ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ সময়ঃ ভোর ৪ঃ১০
নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনুপম আঁধারে ঘেরা রাঙ্গামাটি জেলা
নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনুপম আঁধারে ঘেরা রাঙ্গামাটি জেলা

দিদারুল ইসলাম:

আয়তনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জেলা রাঙামাটি। আকাশের মেঘ ছুঁয়ে যায় পাহাড়ের বুক, শরৎ, হেমন্ত এবং শীতে শুভ্র মেঘের খেলাও চলে সবুজ পাহাড়ের ভাজে ভাজে। চারিদিকে সবুজের সমারোহ আর পাহাড়ঘেড়া এ জেলায় রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই হ্রদ। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনুপম আধাঁরে ঘেরা রাঙ্গামাটি জেলা তার রূপ বৈচিত্রের কারণে আকর্ষণীয় স্থান হিসাবে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের হৃদয় স্থান করে নিয়েছে।

বর্তমানে এখানকার প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্র্যে কারণে এই জেলাটি খ্যাতি পেয়েছে 'রূপের রানী'হিসেবে। রাঙ্গামাটি পাহাড়,নদী ও লেকবেষ্টিত একটি বৈচিত্র্যময় জনপদ যেখানে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, মুরং, বোম, খুমি, খেয়াং চাক্,পাংখোয়া, লুসাই, সুদে, সাঁওতাল, রাখাইন সর্বোপরি বাঙালিসহ ১৪ টি জনগোষ্ঠীর বসবাস। সেই সাথে এখানে কিছু অসমীয়া ও গুর্খা সম্প্রদায়ের লোকজনেরও বসবাস রয়েছে।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পর্যটন জেলা রাঙ্গামাটিতে দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম:

কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পিলওয়ে, কর্ণফুলী হ্রদ, পর্যটন মোটেল ও ঝুলন্ত সেতু, সুবলং ঝর্ণা, শুকনাছড়া ঝর্ণা, ধুপপানি ঝর্ণা, মুপ্পোছড়া ঝর্ণা, পেদা টিং টিং, টুকটুক ইকো ভিলেজ, রাইংখ্যং পুকুর, রাজবন বিহার, ঐতিহ্যবাহী চাকমা রাজার রাজবাড়ী, কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার, সাজেক ভ্যালি,ন-কাবা ছড়া ঝর্ণা,বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, কাট্টলী বিল, তিনটিলা বনবিহার, উপজাতীয় জাদুঘর,কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি।

যেকোনো ছুটিতে সময় কাটানোর জন্য এখানে রয়েছে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে থাকা শান্ত জলের হ্রদ। সীমানার ওপাড়ে যেন নীল আকাশ মিতালী করে হ্রদের সাথে, চুমু খায় পাহাড়ের বুকে। এখানে চলে পাহাড় নদী আর হ্রদের এক অপূর্ব মিলনমেলা। রাঙ্গামাটির জেলার প্রধান আকর্ষণ পর্যটন মোটেল ও ঝুলন্ত সেতু শহরের শেষপ্রান্তে কর্ণফুলী হ্রদের কোলঘেঁষে পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স। ১৯৮৬ সালে এটি গড়ে তোলা হয়। আকর্ষণীয় পর্যটন মোটেলটি এখানেই। মোটেল এলাকা থেকে দৃশ্যমান হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশি আর দূরের নীল উঁচু-নীচু পাহাড়ের সারি বিমোহিত করবে যে কোন পর্যটকদের হৃদয়। সেই সাথে এখানেই হ্রদের ওপর রয়েছে ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু। যা কমপ্লেক্সের গুরুত্ব ও আকর্ষণ আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। দুটি পাহাড়ের মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে কাপ্তাই হ্রদের উপর ঝুলে আছে সেতুটি।

সুবলং ঝর্ণা:

রাঙামাটি সদর হতে সুবলং এর দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার। রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার, পর্যটন ঘাট ও রাঙামাটি বিভিন্ন স্থান থেকে স্পিড বোট ও নৌ-যানে করে সহজেই সুবলং যাওয়া যায়। কাপ্তাই লেক ঘুরতে হ্রদে দেশীয় ইঞ্জিন চালিত বোট অথবা স্পীড বোটে চড়লে প্রথমেই চোখ যাবে পাহাড়ের কোল থেকে নেমে আসা সুবলং ঝর্ণার দিকে। বোটে করে সুবলং যাওয়ার আনন্দটাই অন্যরকম। বর্তমানে ঝর্ণায় পানি খুব বেশি নেই তবে ভরা বর্ষা মৌসুমে মূল ঝর্ণার জলধারা প্রায় ৩০০ ফুট উচু থেকে নীচে আছড়ে পড়ে এবং অপূর্ব সুরের মুর্ছনায় পর্যটকদের মুগ্ধ করে যায়।

টুক টুক ইকো ভিলেজ:

লেকে দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অতিথির জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি উপজাতীয় রেস্তোরাঁয় রকমারি খাবারের স্বাদ। কাঠ এবং বাঁশের কারুকাজে তৈরি এ রেস্তোরাঁয় দেশীয় ও পাহাড়ি মজাদার সব খাবারের আয়োজন রয়েছে।৫০ একর জায়গা জুড়ে বহু টিলা-উপটিলায় পুরো ইকো ভিলেজটিতে সুদৃশ্য বেশ কয়েকটি কাঠের কটেজ। অ্যাটাস্ট বাথ, ব্যালকনি-সমেত এ কলেজগুলোতে থাকার ব্যবস্থাও ভালো। জানালার ফাঁক দিয়ে দূরে পাহাড়ের ঢালে কাপ্তাইয়ের পানিতে চাঁদের প্রতিচ্ছবি লেখার দৃশ্য অসাধারণ! রাতেরগভীরে বন-বনানী থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝি পোকা, নাম জানা-অজানা নিশাচর পশু-পাখির বিচিত্র ডাকে অজানা রাজ্য এসে সামনে দাঁড়ায়। আছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ইকো ভিলেজে তৈরি করা হয়েছে ১৫টি গোলাকার ঘর।

পেদা টিংটিং ও চাংপাং:

কাপ্তাই হ্রদের চারিদিকে কেবল পাহাড় আর হ্রদ। বুনো প্রকৃতি ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না এখানে। এরমধ্যেও চলতি পথে কোন একটি টিলার উপর দেখবেন পেদা টিং টিং এবং চাং পাং। পেদা টিং টিং একটা চাকমা শব্দগুচ্ছ, যার অর্থ হচ্ছে পেট টান টান। অর্থাৎ মারাত্মকভাবে খাওয়ার পর পেটের যে টান টান অবস্থা থাকে, সেটাকেই বলা হয় পেদা টিং টিং। এদিকে পেদা টিং টিংয়ের ঠিক অপর পাশে কাপ্তাই হৃদের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত উপজাতী রেষ্টুরেন্ট চাং পাং। যার অর্থ হলো চাইলেই পাই। এখানে পাহাড়ি সমাজের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহি খাবারের পাশাপাশি রয়েছে আরামে কিছুটা সময় কাটাবার জন্য সেগুন বাগানের অভ্যন্তরে নীরবে বসে থাকার বেশ কয়েকটি ছাউনী।

রাজ বনবিহার:

রাঙামাটির দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাজ বনবিহার। এ অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর প্রধান তীর্থ স্থান এটি। এখানে আছে একটি প্রার্থনালয়, একটি প্যাগোডা, বনভান্তের (বৌদ্ধ ভিক্ষু) আবাসস্থল ও বনভান্তের ভোজনালয়। প্রতি শুক্রবার ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে এখানে চলে প্রার্থনা। রাজ বনবিহারে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারেন কাপ্তাই লেকের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। রাজবনবিহারের পাশেই কাপ্তাই লেকের ছোট্ট একটি দ্বীপজুড়ে রয়েছে চাকমা রাজার রাজবাড়ি।

উপজাতীয় যাদুঘর:

রাঙামাটির প্রবেশ দ্বারেই দৃষ্টি কাড়ে উপজাতীয় যাদুঘর। ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু এটির। ২০০৩ সালে নতুন ভবন নির্মিত হলে তা আরো সমৃদ্ধ হয়। এ যাদুঘরে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জাতিসত্তাসমূহের ঐতিহ্যবাহী অলংকার, পোষাক-পরিচ্ছদ, বাদ্যযন্ত্র, ব্যবহার্য তৈজষপত্র, অস্ত্র-শস্ত্র, প্রাচীন মুদ্রা, প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ, পুঁতিপত্র, তৈলচিত্র ও উপজাতীয় জীবনধারার বিভিন্ন আলোকচিত্রের সমাহার।

বার্তাজগৎ২৪/ এম এ

Share on: