ছোটগল্পঃ 'বসন্ত বিলাস'

বার্তা‌জগৎ২৪ ডেস্কঃ

প্রকাশিতঃ ১৭ অগাস্ট ২০১৯ সময়ঃ রাত ১১ঃ৫৯
ছোটগল্পঃ 'বসন্ত বিলাস'
ছোটগল্পঃ 'বসন্ত বিলাস'

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্কঃ

পর্বঃ ১

বসন্ত বন্দনায় বাংলার প্রকৃতি তার শরীরকে সাজিয়েছে অপার মহিমায়,প্রকৃতিতে ঢেলে দেয় অঢেল সৌন্দর্যের সমাহার ও বয়ে আনে ফাগুনের কীর্তি । প্রতি প্রাণের চোখের আয়নায় দেখা মেলে প্রকৃতির ফুলেল শোভাযাত্রা । সে শোভাযাত্রায় আকাশের রামধনু নেমে আসে বৃক্ষরাজির ফাগুন মেলায় । বৃক্ষরাজির যৌবনের উদ্দীপনা যে কতটা প্রখর আর উচ্ছ্বাসময় তা ফাগুনের বুকে গাছের নতুন প্রানসঞ্চয় করা পাতার সবুজের কোলাহলে স্পষ্ট হয় ।তখন গাছে গাছে নতুন পাতা গজায়, ফুল ফোটে । প্রকৃতির সৌন্দর্যের বিপ্লব ঘটে


এমনি এক সৌন্দর্যের সকালে অনুপম বারান্দায় বসে সদ্য খোলা প্যাকেট হতে একটি চারমিনার ধরিয়ে তার ধোঁয়াগুলো শূন্যে বিলিন করে যাচ্ছে যেন সেটিই তার বর্তমান জীবনের উদ্দেশ্যহীনতার প্রতিচ্ছবি ।
অনুপম সরকার যশোরের ছেলে।পরিবারের একমাত্র সন্তান। বাবা স্থানীয় কলেজের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক । বাবা মা আর সে মিলেই তাদের ছোট সংসার । লোক প্রশাসন ও সরকার পরিচালন বিদ্যা বিভাগ হতে স্নাতক ও সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করেছে ময়মনসিংহ ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে । তার একমাত্র ইচ্ছা প্রথম শ্রেণীর একজন সরকারি কর্মকর্তা হওয়া, এরই মাঝে দুই বার বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে পরীক্ষা দিয়ে এই দুইবারই মৌখিক পরীক্ষা থেকে থেকে বাদ পড়েছে । তৃতীয় বারের মত মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছে , ৭ দিন পর ফলাফল বের হবে ।


বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধান অনুযায়ী স্নাতকোত্তর পাশ করার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকাটা দণ্ডনীয় । সে কারনেই অনুপমের বর্তমান ঠিকানা ময়মনসিংহ ত্রিশালের নামাপাড়ার একটি বাড়ির দক্ষিণমুখি চিলেকোঠায়, সেখানে খুব বেশি চাকচিক্যের বহর না থাকলেও একটি বিশেষত্ব আছে যেটা অনুপমকে বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট করে,তার দক্ষিণ মুখী বারান্দাটা । সেই বারান্দায় বসেই সদ্য দেওয়া মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে হিসাব নিকাশ করছে এবং একই সাথে পুরাতন ব্যর্থতাগুলোর হিসাব মিলাতে একটির পর একটি জ্বলন্ত নিকোটিন দণ্ড উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়ায় নিঃশেষ করে দিচ্ছে আর তারই সাথে তাকে সংগ দিচ্ছে ভাঙ্গা প্রাচীরের গা বেয়ে বেড়ে ওঠা জারুল গাছের মগ ডালে বসে থাকা একটি কোকিল দম্পতির উচ্চস্বরে গাওয়া বসন্ত বন্দনা গীতির একটি সৌন্দর্যে মোড়ানো সকাল ।


লেখক দাদা আসতে পারি ? পিছন দিক থেকে একটি মেয়ে কণ্ঠের প্রশ্ন শুনে অনুপম তাকিয়ে দেখল ঊর্মিকে । ঊর্মি বাড়িওয়ালার মেয়ে। । ৮ম শ্রেণিতে পড়ে, অনুপম তাকে অংক এবং ইংরেজি পড়ায় । এই মেয়েটি সম্পর্কে আর কিছু তথ্য দিতে গেলে বলতে হবে ওর লালচে আভা মাখানো দুইটি চোখ ,মাঝে মাঝে চোখ ঘোলাতেও দেখায় । যা সাধারণত মানুষের বেলায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ।
অনুপমকে লেখক বলে সম্বোধন করার বিশেষ কারন অনুপম লেখালিখির সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত , ইতিমধ্যে তার বেশ কিছু বই বাজারে প্রশংসা কুড়িয়েছে । আর এই মেয়েটি অনুপমের একনিষ্ঠ ভক্ত বনে গিয়েছে ।
অনুপম চারমিনারের আগুন নিভিয়ে আকাশের পানে মুক্ত হাওয়ায় শেষ ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছেড়ে দিয়ে বলল আসো ঊর্মি ।
ঊর্মি । আজ কি বই দিবেন? আপনার “অজানায় নিরুদ্দেশ” গল্পটা পড়া শেষ হয়েছে গত রাতেই ।
“বসন্ত বিলাপ” , চেয়ারে হেলান দিয়ে আকাশ মুখী হয়ে মাথাটা অলসতার ভঙ্গিতে নাচিয়ে উত্তর দিল অনুপম ।
ঊর্মি । এই নামের বই আবার কবে লিখলেন! ভীষণ কৌতূহল প্রবণ হয়ে জিজ্ঞাসা করেছে ঊর্মি ।
অলসতার ভাবটা স্থির করে মাথা ডান পাশে হেলিয়ে অনুপম ঊর্মির দিকে তাকিয়ে প্রথমে তার কৌতূহলের গভীরতা পরখ করল তারপর হেসে উঠল ।
অনুপম । লিখিনি এখনও তবে লিখবো ।
ঊর্মি । তাই তো বলি “বসন্ত বিলাপ” বইয়ের কথা বলছেন, কিন্তু আমি জানি না ! আপনার সব বই আমার না পড়া হলেও নাম গুলো কিন্তু মুখস্থই থাকে দাদা ।
অনুপম । তাই নাকি ? কিন্তু যা লিখি তার সব বুঝো তো? নাকি বুঝার ভান করে থাকো যাতে নিজে যে ছোট সে কথা অন্যমানুষ না বোঝে । আমার তো মনে হয় না প্রশ্ন করলে তার ব্যাখ্যা তুমি বুঝিয়ে বলতে পারবে ।
কেন পারব না দাদা ! আমাকে কি আপনার খুব ছোট মনে হয়? রাগে ফুলে উঠে প্রশ্ন করল ঊর্মি। জানেন আমি কবিতা লিখতে জানি ! আমাকে এত ছোট ভাববেন না ।
অনুপম । বাহ বাহ , কবিতা লেখো? দেখিয়ো তো ।
ঊর্মি । এখন দেখাই দাদা ?? ও খুব খুশি হয়েই বলল ।
অনুপম । না এখন না । সন্ধ্যায় তোমাকে পড়ানোর পর দেখবো ।
ঊর্মির মুখটা মলিন দেখাল , তবুও তার সাথে তৃপ্তির হাসি টাও আড়াল হলনা । কারন ঊর্মি চেয়েছিল অনুপম দাদাকে এখনই কবিতাটি দেখাবে ।
এখন যাও তবে । আর সন্ধ্যায় বই খাতা নিয়ে চলে এসো । বেশিদিন হয়ত আর এখানে থাকবো না । সিলেবাস টা শেষ করে দিব ।
ঊর্মি কিছু না বলেই নিচে চলে গেল ।
ততক্ষণে জারুল গাছের মগ ডালে বসে থাকা সেই কোকিল দম্পতি আর নেই ।

৬ মাস আগে অনুপম এখানে এসেছে । বাড়ির পরিবেশ বিশেষ করে চিলেকোঠার ঘরটার জন্য তার আসা । একসময় সাহিত্য চর্চাই ছিল অনুপমের প্রথম ও প্রধান ব্রত । সে ভেবেছিল সাহিত্য চর্চা করেই এ জীবন অতিবাহিত করবে,অনেক বাঙ্গালি ছেলেরা এ বয়সে যা করে থাকে । কিন্তু গত ৩ বছরের নানা অভিজ্ঞতায় সে নিজের চিন্তার কিছুটা পরিবর্তন আনে এবং একটি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের পথে যাত্রা শুরু করে । সেটি যে এখনও সফল হয়েছে বলা চলে না , তবে অনুপম তা সফল করেই তবে মায়ের কোলে ফিরবে বলেই একপ্রকার পণ করেছে । মায়ের কাছে ফিরে যাবার জন্য এবার তার চাঞ্চল্য বেশ লক্ষণীয় ।

অনুপম চেয়ালে হেলান দিয়ে দূরের প্রকৃতি উপভোগ করতে থাকে ।
সূর্যের আনাগোনা ততক্ষণে চারপাশে সাড়া ফেলে দিয়ে ব্যস্ততায় রূপ নিয়েছে ।

কিন্তু সে ব্যস্ততা বেশিক্ষন স্থায়ী হল না । সূর্যের সীমানা ডিঙে মেঘের চাদর আকাশের বৃত্ত ঢেকে দিল । বসন্তের ঝিরিঝিরি বাতাস দক্ষিন হাওয়ায় অনুপমের সামনে রাখা চায়ের কাপ নেচে শব্দ করে উঠল, পাশে পড়ে থাকা শরৎ সমগ্রের পাতা উল্টেপাল্টে যেতে থাকল । এ বাতাস ছুটে এসেছে দূর হিমালয়ের প্রাচীর ভেদ করে ,সুদুর প্রান্তর ঘেঁষে , মেঘেদের দল একজোট বেঁধে নামাপাড়ার আকাশে স্থায়ী হল ।
এ যে বসন্তের প্রথম বৃষ্টি !
ফাগুন মেলার অনাসৃষ্টি ।


বাতাসের শো শো শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে ,এ শব্দের সাথে নাচতে মন চাইল বৃষ্টির, নুপুরের ছন্দে তাই রিমঝিম নৃত্যে চঞ্চলা বায়ুর প্রেমে নেচে উঠল । মুসুল ধারে শুরু হল বসন্তের জলধারা । বসন্তের ফুলের শরীরে , অরন্যের সবুজে স্নিন্ধ জলধারা । মেঠোপথ ,রাস্তা , উঠান জুড়ে বৃষ্টির তবলা বাজছে । ধানক্ষেতে এলোমেলো নাচ । অনুপমের মনে বেজে উঠল হারানো দিনের গান , মনজুড়ে স্মৃতির মেঘের বৃষ্টি ।
তারই সাথে ঝরে যায় বসন্তের প্রথম বৃষ্টি ।

পর্বঃ

দিনের শেষ বেলায় পশ্চিমের আকাশে পাখির দলের ফেরার উৎসবে বোঝা গেল বিকেল শেষ হতে চলেছে । সন্ধ্যার আয়োজন হতে খুব দেরি নেই । আকাশে গোধূলির মেলা বসেছে । দূরে রাখালের দল গরু মহিষ নিয়ে ঘরে ফিরতে শুরু করেছে । লালচে মেঘের নিচে সন্ধ্যা নামার দলছুটে ব্যস্ত জনপদ ।
খানিক বাদে আকাশে সন্ধ্যাতারা জ্বলে উঠল ।
আজ সন্ধ্যায় ঊর্মির খুব সাজতে মন চাইল । বিকেল বেলায় তার বান্ধবি প্রিয়ার বাড়ি থেকে বকুল আর বেলি ফুল নিয়ে এসেছিল । সারা বিকেল জুড়ে বকুল আর বেলি ফুলের মালা গেঁথেছে । মায়ের কাছ থেকে আবদার করে চেয়ে এনেছে বাসন্তী রঙয়ের শাড়ি। প্রথমবারের মত নিজের হাতে সে শাড়ি পড়েছে। ঊর্মি তার লালচে আভার চোখে দিয়েছে কাজল । খোপায় বেলি ফুল । গলায় বকুলের মালা । আয়নায় বারবার নিজেকে দেখে মুচকি হেসে খুনসুটি হচ্ছে । আয়নায় নিজের চোখের দিয়ে ঠায় তাকিয়ে অনেক্ষন নিজের ভাবনার গভীরতা যাচাই করে নিচ্ছে ,একবার মনে হল চুলে বেণী করলে হয়ত আরেকটু সুন্দর লাগত । পরেক্ষনেই আবার সে ভাবনা উড়ে গেল ।


এখন অনুপমের কাছে ঊর্মির পড়তে যাবার কথা, তাই আর দেরি না করে ঊর্মি বই খাতা নিয়ে চিলেকোঠার ঘরের দিকে যাত্রা শুরু করল । যাবার সময় তার লেখা কবিতা নিতে ভুল হল না, কারন অনুপমকে আজ সেটা দেখানোর কথা। অনুপম সকালে যে ঠাট্টা রস করেছিল কবিতাটি দেখিয়ে তার একটা উত্তর ঊর্মি দিবে বলে আগেই ঠিক করে রেখেছিল ।


নিচ তলা থেকে অনুপমের ঘর অন্ধকার দেখাচ্ছে , ঊর্মি ভাবল দাদা মনে হয় আলো জ্বালাতে ভুলে গিয়েছে কিংবা এখনও ঘুমিয়ে আছে । প্রায় সময়ই এমন অবস্থাই থাকে কিনা । কিন্তু সে শঙ্কা পুরোপুরি মিথ্যে হল ঘরে আলো জ্বালিয়ে, ঘরে অনুপম নেই । ঊর্মি অনুপমের অপেক্ষায় ঘরময় পায়চারী করতে থাকে । এভাবে অনেক্ষন যাবার পরে বিষন্ন মনে ঊর্মি চিলেকোঠার বারান্দায় গিয়ে বসল । এ বারান্দায় বসে অনুপম দিনের অনেকটা সময় কাটায় । একদিন অনুপমকে ঊর্মি প্রশ্ন করেছিল দাদা এখানে বসে আপনি কি এত ভাবেন । অনুপম বলেছিল , মানুষের সাথে এই প্রকৃতির ভারি মিল । ঋতু আসে ঋতু যায়, অনেক সময় বদলায় , গাছের পুরাতন পাতাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে গাছ নতুন পুস্প পল্লবে ফুটে ওঠে ।
এত কঠিন কথা ঊর্মি খুব একটা বুঝতে পারত না কিন্তু অনুপমের বলার ভঙ্গি টা ঊর্মির খুব ভাল লাগত । সে এক দৃষ্টিতে অনুপমের দিকে চেয়ে থেকে থেকে অনুপমের কথার সাথে কল্পনা করার চেষ্টা করত ।
খানিক পরে ঊর্মি আবার অনুপমের ঘরে গেল । টেবিলের উপর রাখা অনুপমের ডাইরির ভাজে তার লেখা কবিতাটি দিয়ে নিচে নেমে এল । আর চাদের আলোর কাছে বন্ধক দিয়ে গেল চিলেকোঠার টেবিলের উপর রাখা বকুল ও বেলি ফুলের মালা ।

পর্বঃ

আজ চৈত্রের প্রথম দিন ।ফাগুনের হাওয়া বদলেছে ।খরতাপে প্রকৃতির অনেক সৌন্দর্য বিলিন হতে শুরু করেছে ।
অনুপম এত দিনেও নামাপাড়ায় ফেরেনি । কোন খবরও পাওয়া যায়নি । ঊর্মি অনেকবার অনুপমকে খুজতে চিলেকোঠার ঘরে গিয়েছিল । বকুল আর বেলির মালা শুকিয়ে সেখানেই পড়ে রইল । তা দেখে বিষণ্ণ মনে বার বার নিজের ঘরে ফিরে এসেছে ঊর্মি ।

সে দিন ঊর্মি তার বিদ্যালয় থেকে ফিরে মায়ের কাছে শুনল অনুপম এসেছিল, সে কাঙ্ক্ষিত ক্যাডার পেয়েছে । কিন্তু বেশি সময় দিতে পারেনি, চলেও গিয়েছে । যাবার সময় কোন আসবাব বা বই নিয়ে যায়নি । সব বই অনুপম তার প্রিয় ছাত্রীকে আশীর্বাদ সরূপ দিয়ে দিয়েছে ।
সে দিনের সকল অভিযোগ অনুযোগ ব্যাথার ভারে যেন ঊর্মির মনে নুয়ে পড়েছিল । সারা ফাগুনের আবেগি চাঞ্চল্যে খরা পড়ে গেল । বিলাসী বসন্ত এক নিমিষে এক কিশোরীর মনে বিলাপে পরিণত হল ।

 

লেখকঃ সিফাত শাহরিয়ার প্রিয়ান
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

বার্তা‌জগৎ২৪.কম/এফ এইচ পি