বৈশাখ উদযাপনের ধরনে যেন শ্রেণিগত ব্যবধান না থাকে

বার্তা জগৎ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ১৩ এপ্রিল ২০১৯ সময়ঃ দুপুর ১ঃ৫৬
বৈশাখ উদযাপনের ধরনে যেন শ্রেণিগত ব্যবধান না থাকে
বৈশাখ উদযাপনের ধরনে যেন শ্রেণিগত ব্যবধান না থাকে

 

মানুষ তার জীবন ধারণের অনুষঙ্গ হিসাবে আচার-অনুষ্ঠান করে। কিছু আচার-অনুষ্ঠান অনুকরণে, কিছু নিজের আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে সবাই পালন করার একটা সামাজিক রীতি থাকে বলে পালন করা হয়। কিন্তু প্রত্যেকটি আচার অনুষ্ঠানের শ্রেণি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ। একটি আচার-অনুষ্ঠান কোন শ্রেণির মানুষের জীবনের সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ সেই বিবেচনার মাপকাঠিতে বিবেচ্য হয় তার মূল্যমান। যেটার জীবন ঘনিষ্ঠতা যত বেশি এবং যত বেশি সংখ্যক সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে সেটার মূল্যমান ততো বেশি। হাজার বছরের সংস্কৃতির অংশ হিসাবে প্রতি বছর পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখ কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রশ্নটা যখন তোলা হয় তখন দেখা যায় পহেলা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতিতে পাঁচশত বছরও পার করে নাই। আর পহেলা বৈশাখ প্রথম থেকে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ছিল না। বৈশাখের এই উৎসব ছিল শাসক শ্রেণির জন্য উৎসবের কিন্তু প্রজার জন্য নিয়মের জালে বন্দীর। নতুন বছরের হালখাতা, খাজনা পরিশোধের বোঝা আসত সাধারণ বাঙালির কাঁধে। সাধারণ বাঙালির জীবনের সাথে পহেলা বৈশাখ থেকে ঘনিষ্ঠ উৎসব ছিল চৈত্র সংক্রান্তি। বছরের শেষ দিনে চৈত্র মাসে উঠা ফসল দিয়ে উৎসব পালন করতো আমজনতা। আস্তে আস্তে চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব বিলুপ্ত প্রায়। চৈত্র সংক্রান্তিকে পাশ কাটিয়ে বাঙালির জীবনে জায়গা করে নিল পহেলা বৈশাখ।

আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের আগমনে আবেদন জানিয়ে লিখেছেন- ‘এসো হে বৈশাখ। এসো এসো’। এখানে রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের আগমনী গানের মধ্য দিয়ে নিজের শ্রেণি চরিত্রের জানান দিয়েছেন নাকি এটিকে বাঙালির জীবন ঘনিষ্ঠ করে তুলতে চেয়েছেন? সেটার উত্তর গবেষণার বিষয়। সেটা এখানের আলোচ্য না হলেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। তিনি দূর হয়ে যেতে বলেছেন পুরাতন স্মৃতি ও ভুলে যাওয়া গীতিকে, সুদূরে মিলাতে বলেছেন অশ্রুবাষ্পকে। অশ্রুবাষ্পকে সুদূরে মিলাতে বললেও সব পুরাতন স্মৃতিকে আমরা দূরে ঠেলে দিব না। হয়তো রবীন্দ্রনাথও বলেন নি। তিনি হয়তো পুরাতন বলতে পুরাতনের মধ্যে গ্লানি এবং জরাকেই বোঝাতে চেয়েছেন যা তার পরবর্তী লাইনে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ইস্যুতেই এই বৈশাখ আমাদের আপন হয়ে ওঠে। পহেলা বৈশাখের এই অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে আমাদের জীবন ঘনিষ্ঠ এবং প্রতিবাদের ভাষা। রবীন্দ্রচর্চা রোধ করতে রেডিও পাকিস্তানে যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারে নিষেধাজ্ঞা প্রচারিত হল তখন ছায়ানট ও উদীচীর মাধ্যমে বৈশাখের এই আগমনী গান গেয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন ছিল প্রতিবাদের একটি অস্ত্র। খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়- পহেলা বৈশাখের যে উদযাপন শাসক বা খাজনাদায়কারী শ্রেণির হাত ধরে শুরু হয়েছিল সেই অনুষ্ঠান সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে গেল। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, সময়ের পরিক্রমায় পহেলা বৈশাখের এই উদযাপনে লোকাচার অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠতা স্থান করে নিয়েছিল।

সাধারণ মানুষের এই ঘনিষ্ঠতা বর্তমানে লক্ষণীয়। বর্তমানে নাগরিক সমাজে বৈশাখের যে উদযাপন তার সাথে সাধারণ মানুষের আচার-অনুষ্ঠানের কোন সংযোগ নেই। কিন্তু তারপরও মানুষ এটা পালন করছে? এখন প্রশ্ন হতে পারে, কেন? কারণ এই উদযাপনের পিছনে আছে কর্পোরেট পুঁজি যা শহরের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তশ্রেণিকে অনুগামী করতে সক্ষম হয়েছে। আবার এটাকে ঘিরে শহরের নিম্নবিত্ত মানুষের একটা অর্থনীতিও গড়ে উঠেছে। কিন্তু আখেরে এই উদযাপন দিনে দিনে যান্ত্রিক হয়ে উঠছে এবং জীবন ঘনিষ্ঠতা হারাচ্ছে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনে আজকের রেওয়াজ অর্থাৎ সকালের পান্তা-ইলিশ সাধারণ মানুষের জীবনপ্রণালী থেকে উত্থিত নয় এবং খুব বেশি দিনের নয়। আশির দশকে এটা শহরের নাগরিক সমাজের মস্তিষ্ক প্রসূত। এভাবেই নাগরিক সমাজের প্রচারের কাছে মার খেয়ে যায় জনমানুষের আচার-অনুষ্ঠান। হারিয়ে ফেলে সাধারণের জীবন ঘনিষ্ঠতা। যে অনুষ্ঠান পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছিল প্রতিবাদের ভাষা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার অস্ত্র সেই অনুষ্ঠানে আজ দেখা যায় নারীর শ্লীলতাহানি, বখাটেদের উৎপাত এবং ফটকা পুঁজির দৌরাত্ম্য। সেই উদযাপন নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আজকের দিনে যে কোন উৎসব পালনে অর্থের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার যেমন করা যাবে তেমনি এটিও আমাদের সচেতনভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন পুঁজির নগ্ন হস্তক্ষেপে   উৎসবের মূল চেতনা ভূলুণ্ঠিত না হয়। অশুভ শক্তির প্রেতাত্মা জাতীয় অগ্রগতি রোধের জন্য যখন জাতীয় সংস্কৃতির গতিপথকে রুদ্ধ করতে চায় আমরাও তখন বিভিন্ন কারণে সেটাকে সংকুচিত করে পালন করতে চাই। এই সংকোচনের ফলে জনমানুষের অংশগ্রহণ বাঁধাগ্রস্ত হয়। আচার-অনুষ্ঠান তার সামগ্রিক আবেদন হারিয়ে ফেলে। এই বিরুদ্ধে একমাত্র উপায়ই হল মানুষের মাঝে অনুষ্ঠানের তীব্রতা ছড়িয়ে দেওয়া। যার জাগরণের মধ্য দিয়ে সাধারণ জনগণ তার জীবন ঘনিষ্ঠতা খুঁজে নিবে। জীবনের সংশ্লেষ ঘটাবে উৎসবের উন্মাদনায়। উৎসব মানুষকে দিবে অবারিত প্রাণশক্তি যার কাছে পরাজিত হবে অশুভ শক্তি। আগামীর কাছে আমাদের এটাই প্রত্যাশা।

লেখকঃ সায়েম খান

রাজনৈতিক কর্মী।