ভূত-পিশাচের হাতে মানুষের মুক্তির পথ রুদ্ধ হতে পারে না

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিতঃ ২৫ মার্চ ২০১৯ সময়ঃ রাত ১০ঃ৩০
ভূত-পিশাচের হাতে মানুষের মুক্তির পথ রুদ্ধ হতে পারে না
ভূত-পিশাচের হাতে মানুষের মুক্তির পথ রুদ্ধ হতে পারে না

স্বাধীনতা শব্দটির মধ্যে রাজনৈতিক দ্যোতনা বেশি। যদিও মানুষের স্বাধীনতা কয়েক ধরনের। যেমন- ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সামাজিক স্বধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বধীনতা প্রভৃতি। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির মিল বন্ধনের সূত্র হল ‘স্ব + অধীনতা’। এর অর্থ হল ‘কেবলই নিজের অধীনতা’। মানে পরের অধীনতা থেকে মুক্তি। পরের অধীনতা থেকে মুক্তি লাভের প্রশ্নই যখন আসে তখন সেটা রাজনৈতিক বিবেচনার মধ্যে চলে আসে। ২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। প্রশ্ন হতে পারে ২৬ মার্চ কেন? কারো কারো মতে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ থেকে নিজের গাড়িতে পাকিস্তানি পতাকার পরিবর্তে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ব্যবহার করা শুরু করেন। তাহলে এইসব দিন স্বাধীনতা দিবস না হয়ে ২৬ মার্চ কেন? কারণ এই দিনগুলোতে স্বাধীনতার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া হলেও স্বাধীনতার জন্য আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয় ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে। বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে সর্বশেষ যে বার্তাটি দেশের জনগণের উদ্দেশে দিয়ে যান সেটাই স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর হতে স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এইসব কথা বলায় হয়তো অনেকে মনে করছেন, একই ধরনের আলোচনা বারবার কেন? তার কারণ হচ্ছে পুরনো বিষয়কে আমরা নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে চাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনার পর থেকে খুবই সুচিন্তিতভাবে আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক করার জন্য এই প্রশ্নগুলো তোলা হয়েছে। বড়ই হতাশার বিষয় হল যে, আমাদের জনগণের একটি অংশ এইসব প্রশ্নের দোলাচলে ভান্তিতে ডুবে যায়। সকল প্রকার ভ্রান্তি দূর করার জন্য এখানে জিয়াউর রহমানের একটি লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি। তিনি নিজেই একটি নিবন্ধে লিখছিলেন ( ‘একটি জাতির জন্ম, দৈনিক বাংলা, ২৬ মার্চ ১৯৭২ এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২)-

‘৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বলে মনে হলো। আমরা আমাদের কল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে তা জানালাম না। বাঙালি ও পাকিস্তানি সৈনিকদের মাঝেও উত্তেজনা ক্রমেই চরমে উঠেছিল’। ( সরকার, যতীন, ফেব্রুয়ারি-২০০১, বিনষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি, ইত্যাদি প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-৬৮)

এটা ছিল স্বাধীনতা নামক বিষয়টিও যে এদেশে রাজনীতির শিকার হয়েছে সেদিকের আলোচনা। এবার একটু ভিন্ন দিকে চোখ বুলাই। স্বাধীনতা বলতে নিজের অধীনতাকে যেমন বুঝায় ঠিক তেমনি নিজের ইচ্ছায় যা খুশি তাই করাকে বুঝায় না। নিজের অধীনে থাকতে হবে মানে নিজের ইচ্ছাগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এটাকে বলা হয় স্বধীনতার দায়। একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা ততটুকুই যতটুকুতে অন্যের অধিকার খর্ব না হয়। তিনি নিজের অধিকার যেভাবে সুরক্ষিত করবে সেভাবে অন্যের অধিকারের নিশ্চয়তার প্রতি তার শ্রদ্ধা থাকবে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্র নিজের স্বধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি যেমন অবিচল থাকবে তেমনি অন্য রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবে। ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে স্বাধীনতার জন্য অনেক আন্দোলন সংগ্রাম হলেও স্বাধীনতার প্রশ্নটি রাজনৈতিক আলোচনায় স্থান পেয়েছে অনেক পরে। এখানে স্বাধীনতার আগে ‘স্বরাজ’ কথাটি স্থান পেয়েছে। শাব্দিক জায়গা থেকে দেখলে স্বরাজের ক্ষেত্র স্বাধীনতার চেয়ে কম। স্বরাজ মানে হল নিজের শাসন। যেখানে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ নয় মাস এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এতো স্বল্প সময়ে এতো বড় উৎসর্গের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের একটি উদাহরণই পৃথিবীতে নাই। স্বাধীনতা অর্জনের পর আমরা মনে করেছি আমাদের কাজ শেষ। স্বাধীনতা রক্ষার দায় যে আমাদের উপর বর্তেছে সেদিকে খেয়াল ছিল না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন’। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য অর্জনের পথের সংস্কৃতিকে পাথেয় করা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীনতার পরে আমরা কি সে পথ বেমালুম ভুলে যাই নাই? স্বাধীনতার পর প্রতিবিপ্লবীরা তাদের যুদ্ধের ফ্রন্ট পরিবর্তন করেছে। সেই ফ্রন্টে আমরা এক অর্থে পরাজিত বলেই ধরা যায়। উৎসর্গীকৃত মনোভাব থেকে আমাদের একটি অংশের মধ্যে দেখা দিল লাগামহীন বৈষয়িক চিন্তা। ৭৫ এর পর এটার পরিব্যাপ্তি ঘটল সবখানে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পাঠানো হলো নির্বাসনে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন শুরু  হল। রাষ্ট্রযন্ত্র যারা চালিয়েছে তারা ভুল পথে হাটলেও, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নির্বাসনে পাঠালেও সেইগুলো জায়গা করে নিয়েছিল জনমানুষের মগজে। তাইতো শেষ সিদ্ধান্তে আমরা পরাজিত হই নাই। এদেশের জনগণের অফুরান প্রাণশক্তি ও অমিত সম্ভাবনার প্রকৃতির কারণে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। নতুন ফ্রন্টের যুদ্ধে আমাদের জয়লাভ ব্যতীত অন্য কোন উপায় নেই। স্বাধীনতাটাকে অর্থবহ করে এদেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির পথ নির্মাণই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করার সৎ সাহস আমাদের থাকতে হবে। সর্বোপরি বলতে চাই, ভূত-পিশাচের হাতে মানুষের মুক্তির পথ রুদ্ধ হতে পারে না।

বার্তাজগৎ২৪/ এ কে