মহানায়িকা সুচিত্রা সেন

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ১৮ জানুয়ারী ২০২০ সময়ঃ দুপুর ১ঃ৩৯
মহানায়িকা সুচিত্রা সেন
মহানায়িকা সুচিত্রা সেন

আফজালুর ফেরদৌস রুমন:

১৯৩১ সালের এপ্রিল মাসের ৬ তারিখে পাবনার তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহুকুমার ভাঙাবাড়ি গ্রামে নানীর বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন একটি মেয়ে। রেওয়াজ অনুসারে মামা বাড়িতে জন্ম নেওয়া কৃষ্ণাকে বেশ কয়েক দিন পরে নিয়ে আসা হয় পাবনা শহরের গোপালপুরের পৈত্রিক বাড়িতে। কৃষ্ণার শৈশব-কৈশোর কেটেছে সেখানেই। সমবয়সীদের কাছে কৃষ্ণা এবং ছোটদের কৃষ্ণাদি। এই কৃষ্ণাই পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা হিসেবে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন এমন এক উচ্চতায় যেখানে পৌছানো আজ আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বাকা চাহনী, অসম্ভব সুন্দর হাসি, আর সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা সুচিত্রা সেন, টালিগঞ্জের 'মিসেস সেন'।

বাবা করুনাময় দাসগুপ্ত ছিলেন পাবনা পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও পাবনার অশোক স্কুলের প্রধান শিক্ষক আর মা ইন্দিরা ছিলেন গৃহিণী। তিনি ছিলেন কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনী। করুনাময়ের তিন ছেলে আর পাঁচ মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। সুচিত্রা জন্মের সময় খুব একটা ফর্সা ছিলেন না। শ্যামা বর্ণের একটা ছাপ ছিলো। গায়ের রঙের সাথে মিল রেখে তার নাম দেওয়া হলো কৃষ্ণা। নামটি দিয়েছিলেন পিতামহ জগবন্ধু দাশগুপ্ত। কিন্তু করুণাময় হয়ত খুশি ছিলেন না এই নামে। কেননা পরবর্তীতে তিনি মেয়ের নাম দেন রমা। তবে পারিবারিক নাম কৃষ্ণাই থাকে। কারণ জগবন্ধুর উপরে কথা বলার সাহস ছিলো না দাশগুপ্ত পরিবারের কারো। তবে পাবনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহপাঠীদের কাছে রমা নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন তিনি।

ভীষণ স্মার্ট ও আধুনিক মন-মানসিকতার অধিকারী ছিলেন কৃষ্ণা। বাংলার গভর্নর জন এন্ডারসনের স্ত্রী পাবনা বালিকা বিদ্যালয়ে এলে তার সম্মানে কৃষ্ণার নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঋতুরঙ্গ মঞ্চস্থ হয়। রমা কৈশোরে ইছামতি নদী, পদ্মার তীরে বেড়াতে, গাছে উঠে ফল খাওয়া, বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ উপভোগ ছাড়াও নদীতে নৌকাবাইচ দেখতে যেতেন। সাজতেন প্রিয় বাসন্তী পূজোয়। তার প্রিয় রাত ছিল কালীপূজোর রাত। দোলের দিন রমা বৈষ্ণব পদাবলীর রাধিকা সাজতেন।

১৯৪৭ এর শুরুর দিকে রমার বড় বোন উমার বিয়ে হয়। এরপর অনিবার্য দেশভাগের কথা ভেবে করুনাময়-ইন্দিরা দম্পতি পাঁচ কন্যা উমা, রমা, হেনা, লিনা, রুনা আর দুই ছেলে নিমাই ও চার বছরের গৌতমকে নিয়ে কলকাতায় চলে যান। এরপর তাদের পুরো পরিবারকে আর পাবনাতে দেখা যায়নি।

পুরীতে সপরিবারে বেড়াতে যান রমা। সেখানে চোখে পড়ে যান মেরিন ইঞ্জিনিয়ার দিবানাথ সেনের ঠাকুমার। আদর সোহাগ আর বাড়তি শাসন পেয়ে বেড়ে উঠা রমা তখন বিয়ের জন্যে পুরোপুরি প্রস্তুত না হলেও কলকাতার বনেদি পরিবার দেখে না করতে পারেননি করুনাময়। বিয়েটা যখন হয় তখন রমার বয়স ১৬ বছর। দিবানাথের বাবা ছিলেন ব্যরিস্টার আদিনাথ সেন। দিবানাথের পরিবারের আদিনিবাস ছিলো ঢাকার গ্যান্ডেরিয়ায়। বিয়ের পর, স্বামীর নামের বরাতে রমা দাশগুপ্ত হয়ে যান রমা সেন।

৩২ বালিগঞ্জ প্লেসের প্রাসাদোপম বাড়ি অর্থ্যাৎ শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর, অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন রমা। কেননা তার শ্বশুরবাড়ির পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়া তার জন্যে কঠিন ছিলো। শ্বশুরবাড়ির আগাগোড়া ছিলো আভিজাত্যে টুইটম্বর। স্বামী খুব কাছের মানুষ হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি। পরে রমা জানতে পারেন দিবানাথের বেপরোয়া জীবনযাপনকে সংযত করতে শ্বশুর আদিনাথ সেন পুত্রবধূ করে তাকে ঘরে এনেছেন। তবে তার শ্বশুর তাকে নিজ মেয়ের মতোই ভালোবাসা আর স্নেহ দিয়েছেন। 

তার অসাধারণ সৌন্দর্য্য এবং ব্যক্তিত্বের জন্য এরই মধ্যে পাড়ার ছেলেদের চোখে পড়ে যান রমা। নিজ পাড়ায় নটীর পূজা নাটকে প্রথম অভিনয় করলেন তিনি। অভিনয়ের কারিশমা দেখিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে দিলেন। এরপর ঘটে গেল রমার জীবনের সবচেয়ে বর টার্নিং পয়েন্ট। রমার শ্বশুরের প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ভাই বিমল রায় ছিলেন পেশায় ফিল্মমেকার। তিনি রমাকে প্রথম দেখায় মুগ্ধ হন, সিনেমায় কাজ করার প্রস্তাব দেন। রমা অনুমতির জন্যে তার শ্বশুরকে বলেন। তার শ্বশুর এবং স্বামী উভয়ই রাজি হন। এক্ষেত্রে জানা যায়, স্বামীর আর্থিক অস্বচ্ছলতা অন্যতম কারণ ছিলো রমাকে অভিনয় করতে অনুমতি দেওয়ার প্রধান কারণ।

এই ঘটনাটি তার বিয়ের আড়াই বছরের মাথায় ঘটে। তবে প্রথম চলচ্চিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা সুখকর ছিলো না তার জন্যে। কারণ ১৯৫২ সালে শেষ কোথায় নামের একটি বাংলা সিনেমাতে তিনি  অভিনয় করেন যা অজ্ঞাত কারণে মুক্তি পায়নি। এই ছবিতে তিনি রমা সেন নামেই কাজ শুরু করেন।

ছবি মুক্তি না পেলেও সিনেমা পাড়ায় যাতায়াত ছিলো রমার। যাতায়াতের সুবাদে নজরে পড়ে যান সুকুমার দাশগুপ্তের সহকারী নীতিশ রায়ের। তার সুবাদে সাত নম্বর কয়েদি চলচ্চিত্রে কাজ পেয়ে যান। এই সিনেমাতেই নীতিশ রায় তার নাম দেন সুচিত্রা।

তারপর থেকে সুচিত্রা সেন নামেই সিনেমা পাড়ায় পরিচিত হতে থাকেন। সাত নম্বর কয়েদিতে সিলেক্ট হবার পেছনে তার মূল যোগান দেয় মনভোলানো হাসি, স্বচ্ছ গভীরতায় ডুবে যাওয়া মায়াবী চোখ আর মিষ্টি কন্ঠ। সাত নম্বর কয়েদী  সিনেমাতে অভিনয় করার পর সুচিত্রা সেন পিনাকী মুখার্জি পরিচালিত সংকেত সিনেমায় অভিনয় করেন।

তার পরের সিনেমা অর্থাৎ নীরেন লাহিড়ীর কাজের  মাধ্যমে ১৯৫২ সালে রমা সেন পাল্টিয়ে সুচিত্রা সেন নামে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। একে একে চলচ্চিত্রে কাজ আর সফলতা নিয়ে উল্কার বেগে ছুটতে থাকেন সুচিত্রা। ১৯৫৩ সালেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য সিনেমাতে তিনি অভিনয় করেছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়ার চরিত্রে। আর এই সিনেমাটিই তার জীবনকে পাল্টে দিয়েছিল।

তার অভিনীত চলচ্চিত্রে গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা গান, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনা ও সন্ধ্যা রায়ের প্লেব্যাক ৩টি রমা সেনকে সুচিত্রা সেন হতে সাহায্য করেছে। একই বছর মহানায়ক উত্তরকুমারের সাথে তার প্রথম ছবি সাড়ে চুয়াত্তর মুক্তি পায়। বক্স অফিসে সাড়া ফেলে দেয় এই সিনেমা। একইসাথে বাংলা চলচ্চিত্র পায় নতুন এক রোমান্টিক জুটি। এই জুটি এরপর অভিনয় করে প্রায় ৩০টির মত ছবিতে। এই জুটি তখন আকাশচুম্বী সফলতা পেতে শুরু করে। উত্তম একবার মন্তব্য করেই বসলেন, রমা যেন আমাকে পূর্ণ করল।

এটি ছিলো তার ফিল্ম ক্যারিয়ারের প্রথম হিট সিনেমা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সুচিত্রার চলন-বলনের নিজস্ব স্টাইল যেন ক্রমেই অনুকরণীয় হয়ে উঠেছিলেন যুবতীদের কাছে। তার শাড়ি পরা বা চুল বাঁধার কেতা ছিলো পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে কলকাতা, ঢাকার বাঙ্গালি সমাজে আভিজাত্য এবং ফ্যাশন সচেতনতার প্রতীক।

উত্তম কুমার ছাড়াও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অশোক কুমার, বসন্ত চ্যাটার্জীর সহ বেশ কিছু নায়কের সঙ্গে জুটি বেঁধে অসাধারণ কিছু ছবি উপহার দিয়েছেন তিনি । দেবী চৌধুরানী ছবিতে রঞ্জিত মল্লিকের স্ত্রী হিসেবেও অভিনয় করেছেন সুচিত্রা সেন ।

১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ১৯টি ছবি মুক্তি পায়। শাপ মোচন, হারানো সুর, ওরা থাকে ওধারে, মরনের পরে, গৃহ প্রবেশ, পথে হল দেরি, ইন্দ্রাণী, সপ্তপদী, গৃহদাহ, হার মানা হার, হসপিটাল, সাথীহারা, আলো আমার আলো, সাত পাকে বাঁধা, সাগরিকা, দত্তা প্রভৃতি সিনেমায় সুচিত্রা সেন তার অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর রেখেছিলেন।

১৯৬৩ সালে সাত পাকে বাঁধা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সুচিত্রা সেন সিলভার প্রাইজ ফর বেস্ট অ্যাকট্রেসয় করেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। সুচিত্রা বাংলা সিনেমার পাশাপাশি হিন্দী সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। ১৯৫৫ সালেই দেবদাস করেছেন। ১৯৫৫ সালের দেবদাস ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেন। দেব আনন্দের সাথে বাম্বাই কা বাবু ও সরহদকে আরো জনপ্রিয় করে তোলে হিন্দি সিনেমার মঞ্চে।

আর গুলজারের পরিচালনায় আঁধি সিনেমাতে ইন্দিরা গান্ধীর চরিত্রে তার অভিনয় সকলকে মুগ্ধ করেছিল। এরপর মমতা এবং আঁধি সিনেমার জন্য ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারের মাধ্যমে সুচিত্রার অভিনয় প্রতিভার প্রতি কুর্ণিশ জানিয়েছিল বলিউড। 

এছাড়াও বাংলা চলচ্চিত্রে সপ্তপদী (১৯৬১), উত্তর ফাল্গুনী (১৯৬৩), আলো আমার আলো (১৯৭২) ও আধি (হিন্দি) ছবির জন্য বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। হিন্দি সিনেমার মমতার জন্য তৃতীয় মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে সেরা অভিনেত্রীর, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী (১৯৭২) ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার (২০১২) অর্জন করেন। ২০০৫ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাদা সাহেব ফালকে সম্মাননা ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সুচিত্রা সেন দিল্লি যেতে হবে বলে সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিত্বের কাছে অনেক নামীদামী নায়ক, পরিচালক বা প্রযোজক হার মেনে যেতেন। ইন্ডাস্ট্রিতে তখন 'মিসেস সেন' এর দাপট এতটাই ছিল যে, তার কথাই শেষ কথা ছিল। সেই সময় তার পারিশ্রমিক আকাশচুম্বী যেমন ছিল তেমনি তার নিজের মতো করে কাজ করার স্ট্যাইল মেনে নিয়েছিল সবাই। এমনকি উত্তম কুমারের চেয়েও তার পারিশ্রমিক ছিল বেশি। সেই সময়ে একটি সিনেমা করার জন্যে সুচিত্রা ২ লাখ টাকা নিতেন।

তিনি সত্যজিৎ রায়, রাজ কাপুরকে পর্যন্ত ফিরিয়ে দিয়েছেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ছবি করতে রাজি ছিলেন সুচিত্রা। কিন্তু শর্ত দিয়েছিলেন সত্যজিৎ তার সঙ্গে যতদিন কাজ করবেন ততদিন অন্য ছবিতে কাজ করা চলবে না। সুচিত্রা এর উত্তরে বলেছিলেন, সেটা কি করে হয়? যারা তাকে সুচিত্রা সেন বানিয়েছেন তাদের তো বাদ দেওয়া চলবে না। তবে তিনি কথা দিয়েছিলেন সত্যজিৎ বাবুর জন্য বেশি সময় দেবেন। কিন্তু পরদিন প্রযোজক যখন চুক্তিপত্রের খসড়া নিয়ে এলেন তাতে এক্সক্লুসিভ আর্টিস্ট কথাটি লেখা দেখে সঙ্গে সঙ্গে সেটি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন প্রযোজককে।

আর রাজকাপুরের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবার পেছনে ছিল অন্য গল্প। রাজকাপুর নাকি সুচিত্রাকে প্রেম নিবেদন পর্যন্ত গিয়েছিলেন। একদিন বালিগঞ্জের বাড়িতে এসেছিলেন রাজ কাপুর সিনেমার প্রস্তাব নিয়ে। সাদা সুট, সাদা নেকটাই আর হাতে একরাশ লাল গোলাপ নিয়ে সুচিত্রার পায়ের কাছে বসে তার প্রযোজিত কোন ছবিতে কাজ করার জন্য বলেছিলেন। রাজ কাপুর কে কিছুটা ব্যক্তিত্বহীন মনে হওয়ায় তার সিনেমায় কাজ করেননি এই মহানায়িকা। সুচিত্রা তখনই তাকে না বলে দিয়েছিলেন। 

এদিকে, ১৯৬১ সালে উত্তম-সুচিত্রার সপ্তপদী ছবি মুক্তির পর ১৯৬২ সালে এই দুই তারকার পর্দা বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এই জুটি ১০ বছরে মোট ২৫টি ছবিতে কাজ করেন। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত উত্তম সুচিত্রা আর কোনো ছবিতে কাজ করেননি। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত মাত্র ৫টি ছবিতে পুনরায় একসাথে কাজ করেছেন। ২৬ বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ৫৩টি বাংলা ও ৭টি হিন্দি মিলিয়ে মোট ৬০টি ছবিতে কাজ করেন ভারতবর্ষের মহানায়িকা সুচিত্রা সেন।

এরমধ্যে ১৯৫৭-৫৮ সালে সুচিত্রার সংসারে ভাঙন ধরে। শুরু থেকেই তার সংসার জীবনে কলহ লেগেই থাকত। ১৯৬৩ সালে সুচিত্রা সেন আলাদা হলেন দিবানাথের কাছ থেকে। ডিভোর্স নয়, আইনগত বিচ্ছেদও নয়। শুধু আলাদা। সুচিত্রা দিবানাথের বালিগঞ্জের বাড়ি ছেড়ে প্রথমে ম্যুর অ্যাভিনিউতে তারপর নিউ আলীপুরে থাকা শুরু করেন। ১৯৬০ সালে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী শচীন চৌধুরীর বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটি কিনে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেন সুচিত্রা সেন। দিবানাথ আমেরিকায় পাড়ি জমান। দীর্ঘ ২২ বছরের যন্ত্রণাদায়ক দাম্পত্যজীবনের অবসান হয় সুচিত্রা সেনের ২৯ নভেম্বর ১৯৬৯ সালে দিবানাথের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। 

১৯৭৮ সালে “প্রণয় পাশা” মুক্তির পর তিনি চলে যান লোকচক্ষুর অন্তরালে। তারপর তাকে আর দেখা যায়নি টালিউড ইন্ডাস্ট্রিতে। খ্যাতি, প্রভাব-প্রতিপত্তি, নাম থাকা সত্ত্বেও এক ঝটকায় বিদায় নিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। নিজেকে আড়াল করেই তিনি রয়ে গেলেন প্রতিটি মানুষের অন্তরে। তাকে রহস্যময় এক নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সুচিত্রা যাকে দেখা যায়না, ছোয়া যায়না কিন্তু অনুভব করা যায়। ব্যক্তিজীবনে উত্তম-সুচিত্রা খুব কাছাকাছি ছিলেন। তাদের নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনা থাকলেও ব্যক্তিজীবনে তাদের বন্ধুত্ব ছিল অকল্পনীয়। উত্তকুমারের সঙ্গে যে ৩০টি সিনেমা করেছেন তাতে সুচিত্রা-উত্তম জুটির রোমান্স এতটাই স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ ছিল যে কখনোই তা অভিনয় বলে মনে হয়নি। আর দুজনের এই রসায়নের কারণেই মেয়ে মুনমুন সেন পর্যন্ত একবার মাকে বলেছিলেন, মা তোমার উত্তমকুমারকে বিয়ে করা উচিত ছিল। শুনে সুচিত্রা শুধু হেসেছিলেন। আসলে সুচিত্রা-উত্তমের মধ্যে যে প্রবল আন্ডারস্ট্যান্ডিং চলচ্চিত্রে রুপ পেয়েছে তা আগে কখনো হয়নি। আর তাই সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত বলেছেন, পৃথিবীতে খুব কম জুড়ি আছে যাদের মধ্যে বন্ডটা এত ম্যাজিকাল। তিনি প্রযোজকদের উত্তমকুমারের উপরে তার নাম লিখতে বাধ্য করেছিলেন। সকলে সেটা মেনেও নিয়েছিল। আর তাই উত্তম-সুচিত্রা জুটি না হয়ে হয়েছিল সুচিত্রা-উত্তম জুটি। তবে উত্তম কুমারের মৃত্যু সুচিত্রার মনোজগতে এক আলোড়ন তুলেছিলো। 

১৯৮০ সালের ২৪শে জুলাই হঠাৎ মারা গেলেন উত্তম কুমার। গভীর রাতে শহর যখন নীরব, সবাই যখন প্রিয় মহানায়ককে শেষ বিদায় জানিয়ে ঘরে ফিরে এসেছে, তখন নিভৃতে দেখা করতে গেলেন সুচিত্রা। ভবানীপুরে উত্তম কুমারের পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে ছবিতে মালা পরিয়ে শেষ সাক্ষাৎটুকু করলেন। সেবার সুচিত্রা উত্তমের মুখ অবয়ব ছুঁয়েই বাড়ি ত্যাগ করেন। সুচিত্রার এই ব্যথিত মন তাকে সবার থেকে আড়াল করে। আবার অনেকে বলেন, দীক্ষাগুরুর মৃত্যুর পর তিনি লোক চক্ষুর আড়ালে চলে যান।

গানে মোর ইন্দ্রধনু, তুমি যে আমার, এই সুন্দর স্বর্নালি সন্ধ্যায়, তুমি না হয় রহিতে কাছে, কে তুমি আমারে ডাকো, ঘুমঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা, জানি না ফুরাবে কবে, নীড় ছোট ক্ষতি নেই এর অসংখ্য কালজয়ী গান আজো তাকে বাঙালিদের কাছে অন্যন্য এক জায়গায় অধিষ্ঠিত রেখেছে। আর উত্তম কুমারের সাথে 'এই পথ যদি না শেষ হয়' প্রতিটি বাঙালির মাঝে বিচরণ করে যায় এখনো। এসব গান এবং সুচিত্রার আবেদন আজো ফুরায়নি, আর ফুরাবেনা কোনদিন। 

২০১৩ সালে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর আবার আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেন সুচিত্রা। এবং ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ২৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সুচিত্রা সেনের মৃত্যু হয়। সুচিত্রা চলে গিয়েছেন, রেখে গিয়েছেন তার অনবদ্য অভিনয়, মনভোলানো হাসি আর বাংলা সিনেমার স্বর্ণময় অধ্যায়। এভাবেই আমাদের কাছে চির অম্লান হয়ে থাকবেন আমাদের রমা, আমাদের সুচিত্রা সেন।

বার্তাজগৎ২৪/ এম এ

 

Share on: