যেসব কারনে আশুরার দিনটি মুসলমানদের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সময়ঃ সকাল ১১ঃ০২
যেসব কারনে আশুরার দিনটি মুসলমানদের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ
যেসব কারনে আশুরার দিনটি মুসলমানদের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:

আজ মঙ্গলবার ১০ মুহাররম। পবিত্র আশুরা। আরবিতে ‘আশারা’ মানে ১০। আশুরা অর্থ দশম। তাই ১০ মহররম আশুরা নামে পরিচিত। আশুরা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক তাৎপর্যময় ও গুরুত্ববহ দিন। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পবিত্র আশুরা পালিত হয়।

মুহাররমের ১০ তারিখে বা আশুরা দিবসে ঐতিহাসিক বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ ও স্মৃতিবহ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে আশুরার দিন বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে সমৃদ্ধ। তবে সর্বশেষ কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত নবী-দৌহিত্র হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত এ দিনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

পবিত্র আশুরা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত প্রেরণা-জাগানিয়া একটি দিন। বলা বাহুল্য, পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলাম সবসময় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। 

সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মর্যাদাবান সাহাবি হোসাইন (রা.), তার পরিবার ও সহচরেরা ৬১ হিজরিতে আশুরার দিনে ইয়াজিদের সৈন্যবাহিনীর হাতে কারবালা প্রান্তরে নির্মমভাবে শহীদ হন। ইসলামের সুমহান আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য তার আত্মত্যাগ ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ত্যাগের মহিমা মুসলিম উম্মাহর—এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। জুলুম-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং অসত্য ও অন্যায় প্রতিরোধে হোসাইন (রা.)-এর এ ভূমিকায় মানবজীবনের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু রয়েছে।

ইসলামী বর্ষপঞ্জিতে যে চারটি মাস মুসলিমদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে মহররম অন্যতম। আর ১০ মহররম আশুরার দিনে বিশ্বে সংঘটিত অলৌকিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ঘটনার কারণে দিনটি মুসলমানদের নিকট বিশেষভাবে মহিমান্বিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন, আশুরা বা ১০ মহররম দিনটি মুসলিমদের জন্য নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ।

ইসলামি চিন্তাবিদরা মনে করেন, হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর সময় থেকে মুসলিমরা ১০ মহররম পালন করত। এর পেছনে নানা ধর্মীয় বিশ্বাস নিহিত ছিল।

মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, এই দিনটিতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে এবং এই দিনেই পৃথিবী ধ্বংস হবে, যেটি মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী কেয়ামতের দিন।

এছাড়া, পৃথিবীতে যত নবী ও রসুলগণ এসেছেন তাদের জীবনে এই দিনটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটেছে বলে বিশ্বাস করেন মুসলিমরা।

অধ্যাপক রশিদ আরও বলেন, মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী ১০ মহররম সকল নবী এবং পয়গম্বরদের কেন্দ্র করে নানা ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোর স্মরণ করেই মোহাম্মদ (সাঃ) এর সময়কাল থেকে এই দিনটি পালন করা হতো।

ইসলাম ধর্মমতে, আশুরার দিনে সৃষ্টি করা হয়েছিল  আসমান ও জমিন। আশুরার দিন আল্লাহ পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে নবীদের নিজ নিজ শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় প্রদান করেছেন আল্লাহ। এই দিন হজরত নুহ (আ.)-এর প্লাবন শেষ হয় এবং তুরস্কের ‘জুদি’ নামক পর্বতে গিয়ে থামে নুহ (আ.)-এর জাহাজ।

আশুরার দিন জালিম বাদশাহ নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে নিরাপদে মুক্তি পেয়েছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)। এই দিন মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন হজরত ইউনুস (আ.)। আশুরার দিনে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন হজরত আইয়ুব (আ.)।

হজরত সুলাইমান (আ.) আশুরার দিন তার হারানো রাজত্ব ফিরে পান। এই দিনে হজরত ইয়াকুব (আ.) হারানো ছেলে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে ৪০ বছর পর ফিরে পেয়েছিলেন। এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন হজরত ঈসা (আ.) এবং এই দিনেই দুনিয়া থেকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয় তাকে।

সর্বশেষ ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ওই দিনে ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র সপরিবারে শাহাদাতবরণ করেন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)।

গোটা বিশ্বে ইসলামে দুটি মত রয়েছে- সুন্নি এবং শিয়া - উভয়ের কাছেই আশুরার দিনটি গুরুত্বপূর্ণ এরপর থেকে এই ঘটনাটিও যুক্ত হয় আশুরা পালন করার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে শিয়া মতাবলম্বীরা এই ঘটনাটিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সুন্নি মতাবলম্বীদের কাছেও এই ঘটনাটি গুরুত্ব বহন করে। 

মুসলিমদের অনেকেই আশুরারা দিন রোজা রাখেন। অনেকে আশুরার আগের দিন এবং পরেরদিনও রোজা পালন করেন।

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে রমজান মাস চালুর আগে আশুরার দিন রোজা পালন করা বাধ্যতামূলক ছিল।

মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, এই দিনটিতে নবী মোহাম্মদ (সাঃ) এর পরিবারের যেসব সদস্য মারা গেছেন তাদের জন্য দোয়া পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে সুন্নি এবং শিয়া মতাবলম্বীদের অনেকেই বাড়তি নামাজ আদায় করেন।

তবে সুন্নি মুসলিমদের চেয়ে শিয়া মুসলিমরা আশুরার দিনটিকে যেভাবে পালন করেন সেটি বেশ চোখে পড়ার মতো।

বিভিন্ন জায়গায় তাজিয়া মিছিল বের করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিয়া মতাবলম্বীরা তাদের নিজেরে শরীরে ছুরি মেরে কষ্ট অনুভব করেন।

তাদের বিশ্বাস নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর দৌহিত্র হোসাইনকে হত্যার সময় যে তিনি যে কষ্ট পেয়েছিলেন, তারাও নিজেদের পিঠে ছুরি মেরে সে কষ্ট অনুভবের চেষ্টা করেন।

তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। বাংলাদেশে যেসব তাজিয়া মিছিল বের হয় সেখানে প্রচুর সুন্নি মতাবলম্বীরাও অংশ নেয়। বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ১০ মহররমকে সরকারিভাবে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়। এদিন সরকারি ছুটিও থাকে সবসময়।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ দিনটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন। আশুরার শিক্ষায় দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বার্তা‌জগৎ২৪.কম/এফ এইচ পি