রঙিন চশমা

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ১০ অক্টোবর ২০১৯ সময়ঃ বিকেল ৩ঃ২৭
রঙিন চশমা
রঙিন চশমা

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:

ছোটবেলা নানু-দাদুর কাছে ঠাকুমার ঝুলির গল্প শুনে বড় হয়েছে একটি প্রজন্ম, অথবা স্কুল কামাই করে জাম গাছ থেকে জাম মুখে নিয়ে জামের রসে মুখ ঠোঁট লেপ্টে পুকুরে ঝাঁপিয়ে আনন্দ নিয়েছে একদল বাঁধনহারা কচিকাঁচা, কিংবা মাগরিবের ওয়াক্তে বিকেলের সূর্য পশ্চিম দিগন্তে তলিয়ে গেলে বাড়ি ফিরে বারান্দা বা উঠোনে পাটি পেতে হারিকেন, কুপিবাতি জ্বালিয়ে জোরে জোরে শব্দ করে পাঠ্যবই পড়তে বসে যেতো বাধ্য শিশু হয়ে, বাজার থেকে চার আনার চকলেট সন্দেশ নিয়ে বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকতো তারা।

কথাটা শুনলে যদিও প্রাগৈতিহাসিক মনে হয় কিন্তু ৯০ এর দশকে যাদের জন্ম, মফস্বল শহর বা গ্রামাঞ্চলে, তাদের কাছে ঘটনাগুলো সোনালী স্বপ্ন। বৈশাখী মেলা থেকে ২ টাকা দিয়ে ঘুড়ি কিনে তা নিয়ে সারাদিন উড়িয়ে বেড়ানো আর অন্যের সুতো কাটা ভেকাট্টা। সপ্তাহে একবার সবাই একসাথে বসে, দশঘর লোকজন এক ছাউনির নিচে বসে সাদাকালো টেলিভিশনে বিটিভির আলিফ লায়লা আর ইত্যাদি। চায়ের দোকানে ইয়া বড় বড় রেডিও বাজতো। তখনকার আনন্দগুলো ছিল কাঁচের বয়ামে জোনাকপোকা ভরে।

হুজুগের বশটা হয়তো আমাদের এসেছে ২০০০ সালের পরে। রঙিন টেলিভিশন, রঙিন জীবন। হাজারটা চ্যানেল আর তাতে হাজার রকমের অনুষ্ঠান। এক সময় যখন ১০ বাড়ি দূরের কোনো কাকুর সন্তান জন্মগ্রহণ করলে পুরো মহল্লা জানতো, এখন সহোদর ভাই এর জানতে সপ্তাহ পেরিয়ে যায়। একান্নবর্তী পরিবার থেকে একক পরিবার যত হতে থাকলো, বিলুপ্ত হতে থাকলো ঠাকুমার ঝুলির গল্প। রঙিন টেলিভিশন এনে দিলো নতুন সব ট্রেন্ড যা ছয় মাস অন্তর অন্তর পাল্টালো। গ্যাবার্ডিন এর প্যান্ট থেকে এলো ব্লু জিন্স, অথচ আমরা এটাই জানলাম না, যুক্তরাষ্ট্রের এলাস্কায় সোনার খনিতে কাজ করে যে শ্রমিক, তাদের পোষাকের স্থায়ীত্ব বাড়াতে উদ্ভাবিত পোশাক হলো জিন্স।

এই হুজুগের ঝোঁক, আর নতুনত্বের লোভে, আমরা পেয়েছি নতুন স্মার্টফোন, আর নতুনকে পেয়ে পুরাতন কে জলাঞ্জলি দেয়ার মানসিকতায় আমরা হারিয়েছি আমাদের বিবেক, মূল্যবোধ। তাইতো রঙিন চশমার আড়ালের চোখ গুলো গত পরশুর বিশ্বজিৎ, সাগর-রুনি, তনু, নুসরাত কে ভুলে গেছে, ভুলে গেছে আজকের আবরার, আগামীকাল ভুলে যাবে আপনাকে, আমাকে। কারণ আমাদের ভুলার জন্য হাজারটা কন্টেন্ট আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আছে। শিরদাঁড়া তো বেঁকেছে অনেক আগেই। স্মৃতির বিভ্রম হয়েছে কালের চক্রে। চায়ের টং এ এখন আর রাজনীতি নিয়ে কথা হবে না, কথা হবে ভারতীয় চ্যানেলের মেগা সিরিয়ালে কোন চরিত্র কতগুলো বিয়ে করেছে। কার ঘরে কে আগুন লাগালো। এভাবেই রঙিন চশমার ফ্রেমে একদিন মরিচা ধরবে। আর সেদিন আমি থাকবো চিতায়, আপনি কবরে। অস্তিত্ব বিলীনের পর আর দুনিয়াবী ভাবনায় কি হবে? নতুন কনটেন্টে না হয় এমনিই হারিয়ে যাবো।

(দেবপ্রিয় মিশ্র'র ফেসবুক ওয়াল থেকে)

বার্তা‌জগৎ২৪.কম/এফ এইচ পি

Share on: