রুম্মান রশীদ খান: ম্যান অফ মার্কেটিং ‘দেবী’র সাফল্যের অন্যতম নেপথ্যের তারকা

আফজালুর ফেরদৌস রুমন

প্রকাশিতঃ ২১ নভেম্বর ২০১৮ সময়ঃ বিকেল ৫ঃ৩৫
রুম্মান রশীদ খান: ম্যান অফ মার্কেটিং ‘দেবী’র সাফল্যের অন্যতম নেপথ্যের তারকা
রুম্মান রশীদ খান: ম্যান অফ মার্কেটিং ‘দেবী’র সাফল্যের অন্যতম নেপথ্যের তারকা

 

আয়-ব্যায়ের হিসাবে দেশে-বিদেশে এ বছরের সবচাইতে ব্যবসাসফল বাংলা সিনেমার নাম ‘দেবী’। অনম বিশ্বাস পরিচালিত জয়া আহসানের সি তে সিনেমা প্রযোজিত এই চলচ্চিত্রটি মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র হিসেবে তো বটেই, তবে প্রচার প্রচারণার দিক দিয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আর এই প্রচার-প্রচারণার দায়িত্বে ছিলেন যে ব্যক্তিত্ব, তিনি রুম্মান রশীদ খান। ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের মার্কেটিং কনসালটেন্টের দায়িত্বে থাকা এই মানুষটির সাথে আজ  কথা হয়েছে আমাদের : 

‘দেবী’ চলচ্চিত্র প্রচার প্রচারণার দিক দিয়ে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করেছে। আর তাই শুরুতেই  জানতেই চাই, এই চলচ্চিত্রের প্রচারণার দায়িত্বে কিভাবে এলেন?

আমি সিনেমাপ্রেমী একজন মানুষ। যে কোনো দেশের, যে কোনো ভাষার, যে কোনো চলচ্চিত্র দেখতে আমি রাজি।  বিশেষ করে নিজের দেশের চলচ্চিত্র হলে তো কথাই নেই। যেহেতু আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ব্যবসায় প্রশাসনে পড়েছি এবং আমার বিষয় ছিল মার্কেটিং, স্বাভাবিকভাবেই আমার প্রথম চাকরীও ছিল টিভিএস অটো বাংলাদেশে মার্কেটিং বিভাগে। সেখানে মার্কেটিং প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে আমি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙায় শুরুতে ইভেন্টস এন্ড প্ল্যানিং এবং বর্তমানে ক্রিয়েটিভ ইনচার্জ হিসেবে কাজ করছি। তবে যে কোনো বিষয়েই মার্কেটিংয়ের ভূত আমার মাথায় সব সময়ই চেপে বসে। অভিনেত্রী জয়া আহসান বিষয়টি জানতেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে ২০০৯ সালের কথা। আমি তখন মূল চাকরীর পাশাপাশি দৈনিক প্রথম আলোর সাথে যুক্ত ছিলাম। এই সুবাদে জয়া আহসানের সাক্ষাৎকার নেয়ার মধ্যেখানে জয়া আহসানকে জানিয়েছিলাম, আমি নতুন চাকরী শুরু করেছি। তিনি শুনে খুশি হয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন ঠিকই, তবে পাশাপাশি এও বলেছিলেন, বিনোদন জগতের সাথে এভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাবার পর এরকম গুরুগম্ভীর চাকরী কি আমি করতে পারবো? সে সময় আমি তাকে নানাভাবে স্বপক্ষে যুক্তি দেখালেও বছর খানেকের মধ্যে বুঝে যাই, আমার মূল জায়গা আসলে বিনোদন জগত। এরপর স্রোতের টানে একেক সময় একেক পরিচয়ে আবির্ভূত হলেও বিনোদন জগত ও বিপণন দুটোকে সমন্বয় করার প্রবল ইচ্ছা বরাবরই লালন করে চলেছি। সেটি কখনো কাউকে না জানালেও বিচক্ষণ প্রযোজক জয়া আহসান বুঝতে পেরেছিলেন। এ কারণেই ২০১৬ সালে ‘দেবী’ সরকারী অনুদান পাবার পর তিনি বলেছিলেন, এই চলচ্চিত্রের বিপণন আমাকেই করতে হবে। তখন বিষয়টি সিরিয়াসলি না নিলেও গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি এবং সি তে সিনেমা’র গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিরা আমার সাথে বসেন। কয়েক দফা আলোচনার পর চূড়ান্ত হয় ‘দেবী’ চলচ্চিত্রে আমি মার্কেটিং কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করবো। এভাবেই যুক্ত হয়ে যাওয়া।  

একজন সমালোচক হিসেবে আপনার সাম্প্রতিককালে বেশ সুখ্যাতি রয়েছে। সেই আপনি সরাসরি চলচ্চিত্র প্রচারণায় কেমন করে এলেন এবং কার অনুপ্রেরণায়?

শুরুতেই বলে রাখি, শুধু ‘দেবী’-ই নয়, আনঅফিসিয়ালি আমি বেশ কিছু চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণার সাথে এর আগেও যুক্ত ছিলাম। আমার নিজের লেখা দুটি চলচ্চিত্রের (পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ও পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ২) প্রচারণাতেও কাজ করেছি। তবে ‘দেবী’র সঙ্গে যুক্ত হবার পেছনে সি তে সিনেমা’র প্রবল আগ্রহই প্রধান কারণ। আমরা যারা বিনোদন জগতে কাজ করি, তারা প্রায়ই অনেক কিছু করি আবেগের বশে, অপেশাদার ভঙ্গিতে। তবে সি তে সিনেমা এবং বিশেষ করে জয়া আহসান অভিনয় যেমন করেন গুছিয়ে, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে, প্রযোজক হিসেবেও তিনি ভীষণ সাহসী, অবিশ্বাস্য রকমের পরিশ্রমী এবং অবশ্যই মেধাবী।  

‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ২’র পরে আর কোন সিনেমার গল্প বা চিত্রনাট্য কেন লিখছেন না?

গল্প লিখে তো বসে আছি। কিন্তু কার জন্য চিত্রনাট্য লিখবো? আমি চিত্রনাট্য লিখবার পর তো চিত্রনাট্যকার হিসেবে চলচ্চিত্র পরিচালকের নাম যায়। তাহলে কার জন্য লিখবো? তাছাড়া আমার লেখা মৌলিক চিত্রনাট্য পরিচালনা করবেন কে? এমন চলচ্চিত্রেই কাজ করতে চাই, যে চলচ্চিত্র বড় পর্দায় দেখার সময় মনে হবে চিত্রনাট্যটি আমিই লিখেছি। দর্শকের ভালো লাগুক অথবা মন্দ লাগুক, ব্যক্তিগতভাবে আমি যাতে পর্দায় নিজের গল্প, চিত্রনাট্য, সংলাপ দেখে লজ্জা না পাই। আশা করছি খুব শিগগীরই নতুন কোনো খবর দিতে পারবো আপনাদের।

চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন আপনি। ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণার এমন সুন্দর এবং অভিনব পরিকল্পনা কেমন করে এলো?

সত্যি বলতে, আমি একাই দিগন্ত উন্মোচন করেছি বললে খুব ভুল বলা হবে। একটি উদ্যোগ কখনো একক প্রচেষ্টায় সফল হয় না। সি তে সিনেমা এবং ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের পুরো টীমের, শিল্পী কলাকুশলীদের অবদান আছে এই চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণা সফল হবার পেছনে। আগেই বলেছি, আমি এর আগেও বেশ কিছু চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণায় কাজ করেছি। কিন্তু সেসব কাজ দর্শকের চোখে লাগেনি, ‘দেবী’র কাজগুলো দারুণভাবে সবার নজর কাড়লো। কারণ কি? কারণ একটাই: জয়া আহসান। আমি যখন যা বলেছি, তিনি এবং সি তে সিনেমা’র গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিরা সেটি সফল করার জন্য শেষ বিন্দু দিয়ে চেষ্টা করেছেন। কয়েকটি সাহসী পরিকল্পনা ছিল, যা অন্য কাউকে বললে হেসে উড়িয়ে দিতে পারতেন। যেমন: মাছরাঙা টেলিভিশনে রাত ১০টায় সরাসরি সংবাদ পরিবেশনের বিষয়টি। জয়া আহসান এবং চঞ্চল চৌধুরী পুরোপুরি পেশাদার সংবাদ পাঠকদের মত সংবাদ পড়েছিলেন। এই  পরিকল্পনাটি আমার প্রায় ৫ বছর আগের। ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ এবং পরবর্তীতে এর সিকুয়েলের সময় এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলাম। পারিনি। অথচ জয়া আহসানকে বলা মাত্রই তিনি লুফে নিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে মাছরাঙা টেলিভিশনের অকৃত্রিম সহযোগিতার কথাও বলতে হয়। চট্টগ্রামে গিয়ে জয়া আহসান ও শবনম ফারিয়াকে অনুরোধ করছিলাম টিকেট কাউন্টারে বসবার জন্য। দ্বিতীয় কোনো চিন্তা না করে ত্বরিৎ গতিতে দুজন বক্স অফিসে বসেছিলেন। ফলাফল: মুহূর্তেই তিনদিনের অগ্রীম টিকেট শেষ। ফেব্রুয়ারিতে বলেছিলাম, দেশের বাইরে যেমন চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো নিয়ে বিভিন্ন পণ্য বাজারে বের হয়, ভক্ত-দর্শকরা সেসব পণ্য কিনে থাকেন, আমরাও এমন কিছু করতে পারি। ঠিক তার দুদিন পরই তিনি বিশ্বরঙ-এর বিপ্লব সাহাকে ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের শাড়ি, পাঞ্জাবী ও অন্যান্য পোশাক তৈরির পরিকল্পনা দেন। বিশ্বরঙ-ও অল্প সময়ের মধ্যে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করে, মাস খানেকের মধ্যে ‘দেবী মঞ্চ’র আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনের আগে অনেকেই জয়া আহসানকে বলেছিলেন, অনেক তারকাকে অনুষ্ঠানে হাজির করতে, তারকার সমাগম হলে নাকি অনুষ্ঠানের ঔজ্জ্বল্য বাড়ে। কিন্তু জয়া আহসান বলেছিলেন, অনুষ্ঠানটি যেহেতু সংবাদ সম্মেলনের, এখানে মূল তারকা সাংবাদিক ভাই-বোনেরা। শুধুমাত্র তারাই এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। এই ভাবনা থেকেই সাংবাদিকদের জন্য লাল গালিচা সংবর্ধনার আয়োজন করা হয় ঐ অনুষ্ঠানে। প্রত্যেক অতিথির জন্য কৃতজ্ঞতা স্বরূপ একটি ‘ধন্যবাদ জ্ঞাপন কার্ড’-ও দেন প্রযোজক জয়া আহসান। ‘দেবী’ মুক্তির ২০ দিন পর রবীন্দ্র সরোবরে একটি ম্যাজিক শোয়ের আয়োজন করা হয়। জাদুশিল্পী শাহীন শাহের নির্দেশনায় জয়া আহসান ও শবনম ফারিয়া জাদু দেখান উপস্থিত দর্শকদের সামনে। এই পরিকল্পনাটি ছিল পরিচালক অনম বিশ্বাসের। অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া ‘দেবী’ মুক্তির এক সপ্তাহের মাথায় এক দুর্ঘটনায় হাত ভেঙে হাসপাতেলে পর্যন্ত গিয়েছিলেন। চিকিৎসক তাকে ২১ দিনের বিশ্রামও নিতে বলেছিলেন। অথচ দুর্ঘটনার পর ভাঙা হাত নিয়েই ফারিয়া চট্টগ্রাম গিয়েছেন, বক্স অফিসে বসে টিকেট কেটেছেন। প্রচার প্রচারণার ক্ষেত্রে ফারিয়ার মমতার কথাও আলাদাভাবে বলতে হয়। তার মানে ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের পুরো টীমকে এক সুতোয় বাঁধতে পেরেছিল প্রযোজনা সংস্থা সি তে সিনেমা; যে কারণে টীমের যখন যে অভিনব কিংবা কার্যকরী পরিকল্পনা দিয়েছে, সেটিই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে এ সময়ের চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা?

আমি বরাবরই আশাবাদী মানুষ। আমি আশাতে বাঁচি। আমি নিশ্চিত, দেশে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে চলচ্চিত্রের মান ও সফলতার হারও বদলে যাবে। এত সমস্যা, এত প্রতিকূলতার মাঝেও যারা চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করছেন, তাদের আবেগকে সম্মান না জানানোটা পাপ হবে। প্রায়ই অনেক চলচ্চিত্র দেখে আমার ভালো লাগে, গান শুনে কানে লাগে, বাংলা চলচ্চিত্রের হাল আমলের অনেক গান আমি নিয়মিত শুনি। অথচ অনেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, এখন আর আগের মত সিনেমা হয় না, গান হয় না। এটা মানছি, চলচ্চিত্রের সেই সোনালী দিন হয়তো এখন নেই। তবে এখন যে কিছুই ভালো হয়না, এটি মানতে আমি নারাজ। অনেকে বাংলা সিনেমা নিয়মিত না দেখে মন্তব্য করেন। সাধারণ দর্শকের কথা বাদ দিন, আমরা বিনোদন জগতের মানুষরা, সাংবাদিকরা, এমনকি সিনেমার মানুষরাই বা ক’জন টিকেট কেটে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে নিয়মিত বাংলা সিনেমা দেখেন? আগে দেখতে হবে, তারপর সমালোচনা করতে হবে। আমার বিশ্বাস, সবার দরদের জায়গাটা এক বিন্দুতে এসে মিলে গেলে চলচ্চিত্রের সেই হারানো দিনগুলো আবার ফিরে আসবে। কারণ আমাদের দেশে মেধাবী অভিনয়শিল্পী, লেখক, নির্মাতা কিংবা কলাকুশলীদের কমতি নেই। সবাইকে যথাযথ সুযোগ দিতে হবে, যোগ্য প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে হবে। বাকি ইতিহাস তারাই গড়বে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিনেমার প্রচারণা নিয়ে আমরা তেমন কোন কিছু দেখিনা যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই জায়গাটার জন্য আলাদা বাজেট রাখা হয় এটা নিয়ে আপনার মন্তব্য কি?

বিষয়টি হতাশার। আপনি বাড়িতে মেহমান এলে খুব মুখরোচক কায়দায় রান্না করলেন, কিন্তু পরিবেশনের সময় যাচ্ছে তাই ভাবে খাওয়ালেন, তখন কিন্তু আর রান্নাটা অতিথির উপাদেয় মনে হবে না। আপনি যে মায়া নিয়ে রান্না করেছেন, সেই মায়া’টা অতিথির বুঝতে হবে। আমরা চলচ্চিত্রের মানুষরা সেই দরদ কিংবা মায়াটাই দর্শকের কাছে তুলে ধরতে পারিনা। এর মূল কারণ বাজেট। আমরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই প্রযোজকের সব অর্থ খরচ করে ফেলি কিংবা কখনো অপচয় করে ফেলি। প্রচারণার জন্য যে আলাদা ব্যয় করতে হয়, সেটি ভুলে যাই। কিন্তু একটি চলচ্চিত্র দর্শকের দোরগোড়ায় পৌছে দিলে যে ছবিটি সফল হবে এবং পরবর্তীতে আমি আরো কয়েকটি চলচ্চিত্রের প্রস্তাব পাবো, সেটি ভুলে যাই। অবশ্য বাজেটই একটি চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণার প্রধান বিষয়, তা বলছি না। মূল বিষয়: আন্তরিকতা, ইচ্ছা, সাহস। ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের উদাহরণ টেনেই বলছি, অনেকেই ভেবেছেন এ চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণায় প্রযোজকের প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়েছে। ব্যাপারটি আসলে তা নয়। এই চলচ্চিত্রে প্রযোজক বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রতিটি পদক্ষেপে পা ফেলেছেন। ইচ্ছাশক্তির ডানায় ভর করে স্টেডিয়াম থেকে টেলিভিশন চ্যানেলের নিউজ রুম কিংবা শপিং মলের সেন্টার কোর্ট, দেশ-বিদেশের প্রেক্ষাগৃহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে রবীন্দ্র সরোবর-সর্বত্র বিচরণ করেছে ‘দেবী’ টীম। টিশার্ট, খাবারের বক্স, কাগজের মগ, অলংকার, শাড়ি, পাঞ্জাবী, সেলওয়ার কামিজ, হেলমেট, চাবির রিং, ফোন কাভার ইত্যাদিতে ব্র্যান্ডিং হয়েছে। এর জন্য খুব বেশি বাজেটের প্রয়োজন হয়নি। আন্তরিকতাই যথেষ্ট ছিল। এই আন্তরিকতা দেখিয়েছেন জয়া আহসান, তার সি তে সিনেমা এবং ছবির পুরো টীম। অথচ বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে দেখি এর উল্টোটি। ‘দেবী’ মুক্তির এক মাস পেরিয়ে গেছে। মুক্তির আগে তো বটেই, প্রথম চারদিনেই বড় অংকের অর্থ তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে। পরিবেশক জাজ মাল্টিমিডিয়া সে সময় ঘোষণাও দিয়েছিলেন, ‘দেবী’র প্রযোজক মূলধনের পুরো টাকাটা তুলে আনতে পেরেছেন। অথচ এরপর এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ‘দেবী’র প্রচারণা চলছে। প্রযোজক চাইলেই তার উদ্যম হারিয়ে মনোযোগ অন্যত্র সরিয়ে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এই যে কাজের প্রতি, নিজের চলচ্চিত্রের প্রতি মায়া-এটি দর্শকেরও মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। আর তাই ‘দেবী’ ব্যবসায়িকভাবেও সফল হয়েছে।

‘দেবী’ চলচ্চিত্রের সাফল্যের পর অন্যান্য প্রযোজক বা পরিচালকেরা এবার বিপণন দিক নিয়ে ভাববেন বলে মনে করেন কি??

আমি তো মনে করি, ‘দেবী’র সফলতার রেসিপি ইতিমধ্যেই সবাই বুঝতে পেরেছেন। শুধু মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেই হবে না, সেটি দর্শকের কাছে পৌছে দেবার জন্য চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে নতুন আরেকটি যুদ্ধ করতে হবে। অবশ্যই ‘দেবী’ একটি মনে রাখার মত চলচ্চিত্র, আমার দৃষ্টিতে এ বছরের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। কিন্তু এরকম মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র তো ‘খাঁচা’ও ছিল, ‘অজ্ঞানামা’ও ছিল। ঐ চলচ্চিত্রগুলো তো প্রেক্ষাগৃহে অনেকেই দেখেননি। তার মানে, একটি চলচ্চিত্র সফল হবার জন্য প্রচার-প্রচারণার গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। শৈশব কৈশোরে দেখতাম, চলচ্চিত্র নির্মাতারা নতুন নায়ক-নায়িকাকে দর্শকের কাছে পরিচিত করার জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। জাতীয় দৈনিকে পুরো পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। সে সময় যদি এত প্রচারণা হতে পারে, এই আধুনিক সময়ে কেন নির্মাতা ও শিল্পী কলাকুশলীরা পিছিয়ে থাকেন, আমার বোধগম্য নয়। অনেক ক্ষেত্রে আমি দেখেছি, পরিচালক-প্রযোজক বনাম শিল্পী দুই পক্ষ একে অপরকে দোষারোপে ব্যস্ত থাকেন। এ ক্ষেত্রে অসন্তুষ্টি, অভিযোগ, অনিয়ম-এসবের বেড়াজাল ভেদ করে প্রত্যেককে চলচ্চিত্রকে আপন করে নিতে হবে। অনেকে মনে করেন, রাস্তায় পোস্টার-ব্যানার, দু-চারটি ফেসবুক পোস্ট, লাইভে যাওয়া কিংবা টিভি অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত হওয়াই একটি চলচ্চিত্রের প্রচারণার মূল মাধ্যম। তবে আমার কাছে বিষয়টি অন্যরকম। একেক চলচ্চিত্র একেকরকম প্রচারণার কৌশল দাবী করে। নির্মাতা ও মার্কেটিংয়ের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বুঝতে হবে, কখন কোন কাজটি করতে হবে, কোনটি করতে হবে না। আমি ‘দেবী’র জন্য যে ধরনের কৌশল প্রয়োগ করবো, ‘ক্যাপ্টেন খান’-এর জন্য নিশ্চয়ই সেই কৌশল প্রয়োগ করবো না। মোদ্দা কথা, সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে আরো সচেতন থাকতে হবে। প্রচারণার গুরুত্ব বুঝতে হবে।

সামনে আমরা রুম্মান রশীদ খানকে এরকম ভূমিকায় কি আবারো দেখতেপাবো?

অবশ্যই। কেন নয়? যে কোনো মানসম্পন্ন চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব আমাকে দেয়া হলে আমি আমার টীম নিয়ে অবশ্যই কাজ করবো। এ ক্ষেত্রে নির্মাতাদের আন্তরিকতা এবং পেশাদারীত্ব মনোভাব খুব বেশি জরুরী।

প্রযোজক হিসেবে জয়া আহসান সম্পর্কে কিছু বলুন।

অভিনেত্রী জয়া আহসানের ভক্ত আমরা সবাই। তবে ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের সাথে যারা কাজ করেছেন, তারা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন প্রযোজক জয়া আহসানও আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে অভিনেত্রী জয়া আহসানকে তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন, কখনো ছাপিয়ে গেছেন। আজ যদি কেউ আমাকে ‘দেবী’র প্রচার-প্রচারণার সফলতার জন্য কৃতিত্ব দেন, আমি এই কৃতিত্বের সিংহভাগ দেবো সি তে সিনেমা ও জয়া আহসানকে। প্রচার-প্রচারণার অসংখ্য পরিকল্পনা তার নিজেরও। একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এতটুকু স্থির হতে পারেন না।

এমনও দেখেছি কখনো তিনি সকালের নাস্তা বিকালে খাচ্ছেন, সারাদিনে টিভি স্টেশনে যে কফিটি দেয়া হচ্ছে কিংবা বিএফডিসিতে যে চা-বিস্কুট দেয়া হচ্ছে সেটি খেয়েই দিন পার করছেন। ‘দেবী’ মুক্তির পরদিন প্রচারণার কাজে আমরা গিয়েছিলাম টঙ্গীর চম্পাকলি ও ময়মনসিংহের ছায়াবানী সিনেমা হলে। পথের মাঝে শেষ বিকেলে আমাদের পেটে তখন ইদুর দৌঁড়াচ্ছে। বুঝতে পেরে জয়া আহসান নিজ উদ্যোগে রাস্তার ধারে ছাপোষা এক ভাতের হোটেলে অবলীলায় নেমে পড়েন। কবজি ডুবিয়ে পুরো টীমের সঙ্গে পোড়া মরিচে কামড় বসিয়ে দুপুরের খাবার খান। অনেক অভিনয়শিল্পীকেই বলতে শুনেছি, চলচ্চিত্রের প্রচারণার জন্য জনসম্মুখে যাবার প্রয়োজন নেই কিংবা আমার অমুক ছবিটি সুপারহিট ছিল, সুতরাং নতুন ছবিতে সেই সফল ছবির দর্শকরাই আসবে। নতুন করে প্রচারণার দরকার নেই। এ ক্ষেত্রে প্রযোজক ও অভিনেত্রী জয়া আহসান দ্বিমত প্রকাশ করেন সবসময়ই। তিনি বলেন, আজ যে দর্শকরা আমাকে আকাশে তুলছেন, আমি জানি আমার একটি ভুল পদক্ষেপের কারণে এক মুহূর্তে তারাই আমাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন। এত অহংকার দেখানোটা বোকামী ছাড়া আসলে কিছুই না। যাদের জন্য আমি এখানে, আমরা এখানে, তাদের কাছে ছুটে যেতেই হবে। একটি সফল ছবির জন্য যেমন শিল্পী কিংবা তারকাদের দরকার, ঠিক তেমনি তারকাদেরও দরকার দর্শকদের। দর্শকদের কাছে এ কারণেই বার বার ছুটে যেতে চাই। সেটি নিজের প্রযোজিত চলচ্চিত্র হোক অথবা অন্য প্রযোজকের ছবি।‘-এ ধরনের ধারণা যিনি পোষণ করেন, তাকে নিয়ে আসলে বলার আরো অনেক কিছুই আছে। আজ শুধু এতটুকুই বলবো, যে কোনো নির্মাতা ও কলাকুশলীর জন্য সি তে সিনেমা ও প্রযোজক জয়া আহসান একটি আশীর্বাদের নাম। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমি চাই, প্রতি বছর সি তে সিনেমা দুটি না হোক, অন্তত একটি চলচ্চিত্র নিয়েও যাতে দর্শকের সামনে আসেন। এতে করে বাংলা চলচ্চিত্র আরো সমৃদ্ধ হবে। আমাদের চলচ্চিত্র জগতে জয়া আহসানের মত প্রযোজক খুব বেশি দরকার।

 আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা (সিনেমা/ নাটক/ অন্যান্য অনুষ্ঠান) জানতে চাই।

সবাই জানেন, আমি মাছরাঙা টেলিভিশনে রয়েছি। ‘রাঙা সকাল’ উপস্থাপনা ও অন্যান্য অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও গ্রন্থনার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এই চাকরীই আমার সিংহ ভাগ সময় নিয়ে নেয়।  কারণ আমি আমার কাজের ক্ষেত্রকে খুব ভালোবাসি। মাছরাঙা টেলিভিশনকে খুব ভালোবাসি। চাকরীর পাশাপাশি সময় পেলে নাটক লিখি। নাটক লিখে যাবো, তবে চলচ্চিত্র নিয়ে অনেক বড় কিছু স্বপ্ন রয়েছে। সুযোগ পেলে সেগুলোও পূরণ করতে চাই। চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণায় আরো ব্যাপকভাবে আসতে চাই। সে পরিকল্পনা চলছে। পাশাপাশি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, চলচ্চিত্র সমালোচনা ও ইউটিউব নিয়ে বেশ কিছু ভাবনা রয়েছে। সবাই যদি পাশে থাকেন, একে একে সব ক’টি স্বপ্নই পূরণ করার লক্ষ্যে কাজ করে যাবো।

 

বার্তাজগৎ২৪/ টি আই 

Share on: