শবনম-চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায়

বার্তা জগৎ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ৯ জুলাই ২০১৯ সময়ঃ রাত ১ঃ২০
শবনম-চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায়
শবনম-চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায়

 

আফজালুর ফেরদৌস রুমনঃ

তাঁর প্রকৃত নাম হচ্ছে ঝর্ণা বসাক। ১৯৪০ সালের ১৭ই আগস্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ননী বসাক ছিলেন একজন স্কাউট প্রশিক্ষক ও ফুটবল রেফারী। পরিবারের আগ্রহের কারণে শৈশবেই বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শিখেছিলেন তিনি। একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে সেই সময় তিনি সুপরিচিতি লাভ করেন। সেখানেই একটি নৃত্যের অনুষ্ঠানে কিংবদন্তী পরিচালক এহতেশাম তার নাচ দেখে 'এদেশ তোমার আমার' চলচ্চিত্রের নৃত্যে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। তিনি সেই সময় আরও কিছু চলচ্চিত্রে অতিরিক্ত শিল্পী বা এক্সট্রা হিসেবে অভিনয় করেন। এরকমই একটি চলচ্চিত্রে তার কাজ সেই সময়ের আরেক জনপ্রিয় পরিচালক মুস্তাফিজের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন‘ সিনেমাতে অভিনয়ের মাধ্যমে ১৯৬১ সালে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এ সিনেমাতেই তিনি ঝর্ণা বসাক থেকে হয়ে উঠেন শবনম। এই শবনম নামেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সবচেয়ে সফল এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তান পরবর্তীতে শুধু পাকিস্তানে তিনি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। পাকিস্তান চলচ্চিত্র জগতে তিনি আজো কিংবদন্তি একজন তারকা হিসেবে পরিচিত। একজন হিন্দু অভিনেত্রী হয়েও শবনমের আগে কিংবা পরে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে এতো জনপ্রিয়তা আর কারো ভাগ্যে জোটেনি। 

 

১৯৬১ সালে বাংলা চলচ্চিত্র হারানো দিনের মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন শবনম। ১৯৬২ সালে উর্দু চলচ্চিত্র 'চান্দা'র মাধ্যমে তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানে রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান। এ দু'টি সিনেমাই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। পরবর্তী বছরে 'তালাশ' সমগ্র পাকিস্তানে মুক্তি পেলে ঐ সময়ের সর্বাপেক্ষা ব্যবসা সফল সিনেমার মর্যাদা লাভ করে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শবনম পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে চিহ্নিত হন। পেশাজীবি মনোভাবের কারণে তিনি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের করাচীতে স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকেন। সত্তর দশকের শুরুতে শবনম ললিউডে (লাহোর) পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেন। তিনি নায়িকা হিসেবে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পে ধ্বস নামার পূর্বে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত প্রবল প্রতাপে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন। সম্ভবত বিশ্বে তিনিই একমাত্র চলচ্চিত্র অভিনেত্রী যিনি ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত তিনটি দশক ধারাবাহিক ও সফলভাবে রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করে অগণিত দর্শক-শ্রোতার মন জয় করেছিলেন। শবনম 'আয়না' সিনেমাতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং এই সিনেমাটি পাকিস্তানের সিনেমা হলগুলিতে দীর্ঘদিন যাবৎ চলার রেকর্ড করে। যা এখনো অন্য কোন সিনেমা ভাঙতে পারেনি। শবনম-ওয়াহিদ মুরাদ, শবনম-নাদিম জুটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তার অভিনীত বেশকিছু ইনেমা পাকিস্তানিদের কাছে আজও অম্লান। এমনকি এই প্রজন্মের বহু পাকিস্তানি তারকা শবনমকে ‘আইডল’ মানেন বলেও জানিয়েছেন।

 

প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে অভিনয় জীবনে তিনি প্রায় ১৮০টি চলচ্চিত্রের অনেকগুলিতে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। শবনম অনেকবার সম্মানসূচক নিগার পুরস্কারের পাশাপাশি তিনবার পাকিস্তানের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। কাজী হায়াতের পরিচালনায় ও ঢাকা প্রোডাকশনের ব্যানারে তিনি ১৯৯৯ সালে সর্বশেষ আম্মাজান চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। এই সিনেমার মাধ্যমে ঢালিউডে 'আম্মাজান' হিসেবেও খ্যাতি পান তিনি। মাঝে কিছু অফার পেলেও তিনি রাগ, অভিমান এবং ক্ষোভের কারণে নিজেকে চলচ্চিত্র জগৎ থেকে গুটিয়ে রেখেছেন। এমনকি তার মৃত্যুর পরেও তার দেহ এফডিসিতে যেন না নেয়া বলে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন। অনেক বছর অভিনয়ের বাইরে থাকলেও শবনম এখনো বিচরণ করেন তার ভক্তদের মনে। তবে ৭৯ বছর বয়সী এই শিল্পী আবার কাজ শুরু করেছেন পাকিস্তানের একটি চলচ্চিত্রে। যার নাম ‘আয়না-২’। ১৯৭৭ সালে পাকিস্তানে মুক্তি পাওয়া ‘আয়না’ ছবির সিক্যুয়েল এটি। এই সিনেমায় তার সাথে জুটি হিসেবে দেখা যাবে নাদিমকে। আয়না সিনেমার এই জনপ্রিয় জুটি আবারো ফিরছেন এই চলচ্চিত্র দিয়ে। এছাড়া তিনি সেখানকার একটি কমেডি ধারাবাহিকে অভিনয় করছেন বলে জানা গেছে। 

 

সম্প্রতি পাকিস্তানে হয়ে গেলো ‘লাক্স স্টাইল অ্যাওয়ার্ড ২০১৯’। যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশটির শোবিজ অঙ্গনের সব তারকারা। আর এই অনুষ্ঠানেই সবার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলেন অভিনেত্রী শবনম। লাক্স স্টাইল অ্যাওয়ার্ড-২০১৯ অনুষ্ঠানটিতে যোগ দিতে গত ৫ জুলাই করাচি পৌঁছেন শবনম। সেখানে পৌঁছানোর পর আয়োজকরা বিমান বন্দরেই তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। ৭ জুলাই লাক্স স্টাইল অ্যাওয়ার্ড-২০১৯ অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত হওয়ার পর শবনমের হাতে আজীবন সম্মাননা পুরস্কারটি তুলে দেন ইউনিলিভারের চেয়ারম্যান সাজিয়া সাঈদ।

 

পাকিস্তানের এই সময়ের তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা ফয়সাল কোরেশি, অভিনেত্রী সাবা কামারসহ তুমুল জনপ্রিয় শিল্পী আতিফ আসলামও শবনমকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হন। তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতেও নাকি হুড়োহুড়ি লেগে গিয়েছিলো। এমনকি শবনমের পা ছুঁয়ে সম্মান জানান আতিফ আসলাম। দর্শক সারি থেকে গাইতে গাইতে শবনমকে মঞ্চে নিয়ে যেতেও দেখা গেছে। একজন শিল্পী হিসেবে জীবনের শেষভাগে এসে এই সম্মান প্রাপ্তির পর স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছসিত এবং আনন্দিত তিনি। আশির দশকের শেষদিকে পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন শবনম। পাকিস্তানের নানা সংবাদপত্রে তখন লেখা হয়েছিল শবনমের চলে যাওয়া পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে ধস নামায়। এ থেকেই বোঝা যায় কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। সেই ইন্ডাস্ট্রির কাছ থেকে তার এমন ভালোবাসা এবং সম্মান প্রাপ্তি বাংলাদেশের জন্যও গর্বের।

বার্তা জগৎ২৪/ এম এ

Share on: