সন্ত্রাসবাদের বর্তমান রূপ ও জাতীয় পর্যায়ে সেটার বিশ্লেষণ

বার্তা জগৎ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ৩০ এপ্রিল ২০১৯ সময়ঃ সন্ধ্যা ৭ঃ৩৫
সন্ত্রাসবাদের বর্তমান রূপ ও জাতীয় পর্যায়ে সেটার বিশ্লেষণ
সন্ত্রাসবাদের বর্তমান রূপ ও জাতীয় পর্যায়ে সেটার বিশ্লেষণ

 

বার্তা জগৎ২৪ ডেস্কঃ

বিশ্বায়নের কারণে বিশ্ব আজ ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এ রূপান্তরিত। কোন কোন তাত্ত্বিক এটাকে ‘গ্লোবাল পিলেজ’ ( বৈশ্বিক লুণ্ঠন)  বলার চেষ্টা করেছেন। ভিলেজ আর পিলেজ এর মতো বিপরীতমুখী ধারণায় বিশ্বায়নের গতিমুখ যেমনিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি সকল বিষয়ে মানুষের মধ্যে আপাত বৈপরীত্য দাঁড় করানোর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে সারা বিশ্বে তথ্যের অবাধ প্রবাহ শুরু হয়। তথ্যের এই অবাধ প্রবাহ বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সীমানার ধারণা শিথিল হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে কেউ কেউ সীমানা ধারণাকে জোরালোভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছেন। অর্থাৎ উদারতাবাদের ( লিবারেলিজম) বিকাশের সাথে সাথে কোন কোন ক্ষেত্রে মৌলবাদিতার (ফান্ডামেন্টালিজম) প্রকাশ দেখা দেয়। নব্বইয়ের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বের ভরকেন্দ্র একমুখী হয়ে পড়ে। তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতন ঘটে। পুঁজিবাদী বিশ্ব নিজের টিকে থাকার প্রয়োজনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্বন্দ্ব বিরোধী শত্রুকে চিহ্নিত করে। পাশ্চাত্য পুঁজিবাদ নিজেই এর স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রণ কর্তা হওয়াতে সে ইসলামকে বা ইসলামী মৌলবাদকে তার শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে। আর এটাকে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রোপ্যাগান্ডা থেকে শুরু করে তাত্ত্বিক জ্ঞান পর্যন্ত নির্মাণ করে। ইসলামী মৌলবাদকে তারা মানবতার কমন শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে প্রচারণা চালায়। নিজ দেশেই সে এর একটি বৃহৎ ভোক্তা শ্রেণি পায়। যারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনিবার্য এই সমীকরণ ধরতে না পেরে ইসলাম বিদ্বেষী হয়। ফলশ্রুতিতেই আমরা দেখি, নরওয়ের ব্রেভিক কাহিনী, নিউজল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার মতো ঘটনা। আবার এটার প্রতিশোধ হিসাবে ইসলামী মৌলবাদিতার নামে কিছু জঙ্গি সংগঠন বিভিন্ন জায়গায় হামলা করে থাকে। তার সর্বশেষ সংস্করণ ‘ইস্টার সানডে’-তে শ্রীলঙ্কার বোমা হামলা। এটা ছিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সারাংশ। এখন এখান থেকে আমরা জাতীয় পর্যায়ে ঘটনা এবং জঙ্গিবাদি প্রক্রিয়ার রসদ উদঘাটনের চেষ্টা করবো।

 

সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কায় যে হামলা হয়েছে সেখানে হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায় তারা সকলেই উচ্চবিত্ত শ্রেণি থেকে আসা বিদেশে পড়ালেখা করা উচ্চশিক্ষিত তরুণ। আমাদের হলি আর্টিজানে হামলাকারীদের পরিচয় ও শ্রেণিগত চরিত্রে একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। তারপর থেকে প্রশ্ন উঠতে থাকে যে, কেন শহরের উচ্চবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা নামকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশের বাইরে থেকে পড়ালেখা করে আসা তরুণরা জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। শতভাগ নিশ্চয়তা নিয়ে এটার বিষয়ে স্বতঃসিদ্ধ মন্তব্য না করা গেলেও আমরা এর ধরন বিশ্লেষণের পদক্ষেপ নিতে পারি।  স্বতঃসিদ্ধ মন্তব্য সম্ভব নয় কারণ প্রতিদিনই বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ তার গতি প্রকৃতি বদলে ফেলছে। মুজাহিদীন বা তালেবান নামের একটি রাজনৈতিক শক্তির হাত ধরে এর প্রকাশ ঘটে আজ এই পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়ে মনে করা হতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে জঙ্গিবাদের উৎসারণ। এখন দেখা যাচ্ছে, সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে থাকা তরুণ গোষ্ঠী জঙ্গিবাদের শক্তি হিসাবে কাজ করছে। মোটাদাগে বললে- উচ্চবিত্ত শ্রেণি থেকে আসা, পাশ্চাত্যমুখী পড়ালেখায় অভ্যস্ত , বিদেশে বা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করা প্রভৃতি। সাধারীকরণকৃত ধারণার ব্যতয় ঘটিয়ে জঙ্গিবাদের নতুন গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণের দাবী রাখে। আমাদের উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে বসবাসরতদের মধ্যে দুই ধরনের জীবন ব্যবস্থা দেখা যায়। একটা পাশ্চাত্য ঢঙয়ের, আরেকটা কঠোর ইসলামী অনুশাসনের। পাশ্চাত্য ঢঙটা ভোগবাদিতা শিখায়। উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম জীবনের সীমানা দেখতে পায় না। তার জীবনে সংগ্রামের গল্প থাকে না। ভোগবাদিতায় নিমজ্জিত হতে হতে এক সময় সে জীবনের কোন অর্থ খুঁজে পায় না। হয়তো না চাইতে প্রাপ্তির খাতায় যোগান থাকার কারণে জীবনে নিজের গল্পটাই সে তৈরি করতে পারে না। ব্যক্তিগত অর্জনের খাতায় শুন্য। এভাবে চলতে চলতে এক সময় সে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। আর কঠোর ইসলামী অনুশাসনটা উচ্চবিত্তদের যারা মেনে চলে তারা নিজেদের অর্জিত সুখ সম্পদ হারানোর ভয় থেকে করে। এ রকম পরিবেশে বড় হওয়াদের মধ্যে অবচেতন মনেই ধর্মের প্রতি এক ধরনের অনুরক্তি থাকে। অন্যদিকে পাশ্চাত্যে যারা পড়ালেখা করতে যায় তারা সেখানে পাশ্চাত্যের ‘ইসলামী ভীতি’ সংস্কৃতি দ্বারা প্রান্তিক হতে থাকে। সুতরাং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলামের প্রতি তারা অনুরক্ত হয়। অর্থাৎ জঙ্গিবাদ বর্তমানে বিরাজমান বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিকতার বাই প্রোডাক্ট। আমাদের অধিকাংশই ধারণা করে ধর্মের আসল শিক্ষা তারা পায় নাই। কিন্তু কথাটা সত্য নয়। আমাদের অধিকাংশই ধর্মের শিক্ষা পাই নাই। তাহলে ধর্মের আসল শিক্ষা পাওয়ার ব্যাপারটা শুধু তাদের উপর বর্তাচ্ছে কেন? যে পিতা হত্যা, লুণ্ঠণ,ব্যভিচারের মাধ্যমে অন্যের সন্তানের জীবনকে বিপদসংকুল করে তুলে নিজের সন্তানকে ভাল রাখতে চায় তার কাছে ধর্মের কি শিক্ষা? যে শিক্ষক ক্লাসে ফাঁকি দেয় তার কাছে কি ধর্মের আসল শিক্ষা আছে? যে কেরানী অফিসে ফাইল আটকিয়ে ঘুষ খায় তার কাছে ধর্মের কি শিক্ষা? যে বুদ্ধিজীবী হালুয়া-রুটির ভাগ পাওয়ার জন্য ইনিয়ে বিনিয়ে মিথ্যাকে সত্য হিসাবে দাঁড় করাতে চায় তার ধর্মের স্বরূপ কি? আমরা সকল অধার্মিকরা মিলিত হয়ে নির্দিষ্ট কোন গ্রুপকে আসল ধর্ম শিখাইতে চাইলে সেটা ভণ্ডামি রূপে প্রতীয়মান হবে এবং আমার কাছ থেকে সে শিক্ষা নিবে না এটাই স্বাভাবিক। এই কারণেই বললাম সন্ত্রাসবাদ বর্তমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বাই প্রোডাক্ট। যেই সমাজে তার বিকাশের শিকড় প্রোথিত সেই সমাজ রেখে কখনোই সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করা যাবে না। এতে সাময়িকভাবে বিষবৃক্ষের ডালপালা ছাটাই করা যেতে পারে কিন্তু কাণ্ড থেকে জ্যামিতিক হারে ডালপালা গজানোর সুযোগ থাকে। এই বিষবৃক্ষকে সমূলে উৎপাটনের জন্য সমাজে আমূল পরিবর্তন দরকার। ধর্মের আধ্যাত্মিকতার কথা তুলে এটা রোধ করা যাবে না। ধর্মের যে রূপটা জীবন ঘনিষ্ট সেটার বিকাশ ঘটাতে হবে। জীবনাচারে ধর্মের একটা লৌকিক রূপ আছে সেটাকে শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের জনগণ কখনোই অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, বৈষম্য মেনে নেয় নি বরং প্রতিবাদ করেছে। এখনও মেনে নেয় না। তবে প্রতিবাদও করে না। কারণ জনগণের অনুভূতি ভোতা হয়ে গেছে। আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি, লোকিক আচারে পরিপূর্ণ আমাদের ধর্মগুলোর সাংস্কৃতিক রূপ কতটা জীবন ঘনিষ্ট হয়ে আমাদের সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। ধর্মের আধ্যাত্মিক রূপের পাশাপাশি লৌকিক রূপটাকে জোরালো করতে পারলে আমরা এই সমস্যার সমাধান পেতে পারি। জর্জ বার্নাড শো’-র একটি কথা আছে, ‘ঈশ্বর যার আকাশে থাকে তাকে দিয়ে হয় না এমন কোন পাপ নাই’। ঈশ্বরকে মানুষের মাঝে রূপ দিতে হবে। ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’-  বিবেকানন্দের বাণী খুবই প্রাসঙ্গিক।

 

 

আমি আগেই বলেছি, আর্থ-সামাজিক অবস্থার বাই প্রোডাক্ট জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসবাদ। জঙ্গি সন্ত্রাসী কোথা থেকে আসল সেটা বড় কথা নয়। কথাটা হল, জঙ্গিবাদ প্রতিহত করায় জনগণ নিস্পৃহ। আমরা সকলে এটাকে শুধু রাজনৈতিক দায় মনে করে সরকারের উপর দায়িত্বটা চাপিয়ে দিতে চাচ্ছি। এমন হলে কখনোই আশু সমাধান হবে না। একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল বা অনেকের মধ্যে আছে যে জঙ্গিবাদের উৎপাদন কারখানা ধর্মভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আজ যখন তার স্বরূপ পরিবর্তিত তখন অনেকে টনক নড়লেও আসল বিষয়টা ধরাটা গুরুত্বপূর্ণ। জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসবাদের দায়িত্বটা একজনের উপর থেকে অন্য জনের উপর শিফট হইছে। আজকের দিনে বড় ধরনের কোন ধ্বংসাত্মক কাজ করতে হলে প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন করতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশটা বুঝার জন্য ইংরেজি ভাষার বিকল্প আমাদের নাই। ফলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী না শুধু যে কোন পর্যায়ের মানুষ যে সামাজিক স্ট্যান্ডার্ড জীবনের অন্তর্ভূক্তি থেকে বঞ্চিত সে অবচেতন মনে এই সন্ত্রাসবাদের মনস্তত্ত্বের উর্বর জমিন। আমাদের পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠছে দিনকে দিন। হয়তো এখনও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় নি। তবে ছোঁয়া লাগে নি এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। আগাছা জন্মানোর এমন মনস্তত্ত্বের উর্বর জমিনে চাষাবাদ ছাড়াই কৃষকের কৃতিত্ব নিচ্ছে উচ্চবিত্ত শ্রেণি থেকে বেড়ে ওঠা দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞাত, এদেশের মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস না জানা বিচ্ছিন্ন একটি প্রজন্ম। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার কতটুকু সুযোগ রাখা হয়েছে? ইতিহাসটায় জনমানুষের সংগ্রামের কথা কতটুকু উঠে এসেছে? শিক্ষা ব্যবস্থায় যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা পিতামাতাকেও আক্রান্ত করছে তা দিয়ে আমরা কতটুকু মানবিক হতে পারছি? দেশীয় সংস্কৃতির রস আস্বাদন না করতে পারলে, জনমানুষের সংগ্রামের ইতিহাসের বিস্তার না ঘটলে, মানবিক হওয়া শিক্ষার মূল উদ্দেশ নির্ধারণ করতে না পারলে এই লড়াইয়ে জেতা সম্ভব নয়। ঋত্বিক ঘটকের একটা কথা আমার কাছে অপরিহার্য মনে হচ্ছে। ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, ‘আজকের বাংলাদেশ বাংলা নয়। একটা ফসিল। সকলে হারিয়ে যাচ্ছি, বোধহয় হারিয়ে যাব যদি না শক্তি নিয়ে এই বুজরুকির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই’। সর্বোপরি আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠের দাবি নিয়ে আশাবাদী। শেষ অঙ্কে সমষ্টিরই জয় হবে। মানবতার জয় হবে। মানুষের পৃথিবীতে অশুভের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।

লেখকঃ সায়েম খান

রাজনৈতিক কর্মী।