কবিতার বন্ধ্যা সময়ে সদাজাগ্রত কবি সত্তা হেলাল হাফিজ

বার্তা জগৎ২৪ ডেস্ক

প্রকাশিতঃ ৮ অক্টোবর ২০১৮ সময়ঃ রাত ১ঃ৩০
কবিতার বন্ধ্যা সময়ে সদাজাগ্রত কবি সত্তা হেলাল হাফিজ
কবিতার বন্ধ্যা সময়ে সদাজাগ্রত কবি সত্তা হেলাল হাফিজ

 

নিঃসঙ্গতাকে খুব আপন করে নিয়েও যে সমুদ্রসম এ জীবন পাড়ি দেয়া যায় তা কবি ও সাংবাদিক হেলাল হাফিজকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না। নিভৃতচারী অভিমানী মানবপ্রেমী এ কবি হলেন এক মুকুটহীন সম্রাট যার কবিতায় দ্রোহ ও প্রেম সমান্তরাল গতিতে এগিয়ে গেছে। কখনো কবিকে পাই চেতনার বিপ্লবে, কখনো কাঙাল প্রমিক হিসাবে। ভালোবাসা যে আট পৌড়ে শাড়ির মতন নিতান্ত সাধারণ কিছু হতে পারে, আমাদের সহজাত জীবনের সাধারণ একটা অনুষঙ্গ হতে পারে, যা ব্যতীত সব থেকেও আমাদের খালি খালি লাগে এই বোধটুকু কবি ফুটিয়েছেন প্রচণ্ডভাবে।

 

যে কবি কখনো রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না সেই কবিই সৃষ্ট করলেন রাজনীতির মাঠ কাঁপিয়ে দেয়া অমর স্লোগান। কবির ভাষায়--

'এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'।

মানবপ্রেম কে পুঁজি করে হেঁটেছেন সাহিত্যজগতের অনেকটা পথ। তার ভাষায়- 'নিউট্রন বোমা বোঝ,
মানুষ বোঝ না'।

আহা! কি সরল স্বীকারোক্তি'। স্পষ্টত মানুষের মাঝে দলাদলিকে ইঙ্গিত করেছেন কবি। সব ভুলে মানুষ ভজনে মনোযোগ দিতে বলেছেন।

কবির কবিতার এক বিশাল অংশজুড়ে আমরা প্রেম বঞ্চনার এক বিষবাষ্প দেখি। ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম রসের সন্ধানে হোঁচট খেয়েছেন, বেদনার বিষে নীল হয়েছেন। আর তাই তার কলমে ঝরেছে আগুন। আর তার লেখাই গত কয়েক দশক ধরে রসদ জুগিয়ে যাচ্ছে অগণিত প্রমিকের অশান্ত হৃদয়ে। কবির ভেতরের হাহাকার জীবন্ত হয়ে ঝরে পড়েছে তার কলমের নিব বেয়ে। কবি লিখেছেন--
'এ কেমন তাবিজ করেছো সোনা,
ব্যথাও কমে না বিষও নামে না'।

ব্যক্তি জীবনে প্রচণ্ড অভিমানী এ কবি লেখাতেও অভিমান ঝড়িয়েছেন। বাঙালি প্রেম বোঝে না, বোঝে জেরা করতে। পরিণামে প্রেম টেকে না। জোর করে প্রেয়সীকে ধরে রাখতে চান নি তিনি। হৃদয় নিংড়ানো সেই কথাই বলেছেন কবিতায়-

"হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি
নয়তো গিয়েছি হেরে,
থাকনা ধ্রুপদী অস্পষ্টতা
কে কাকে গেলাম ছেড়ে"।

ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমরা সবাই যখন মিলনের নেশায় বিভোর কবিকেই দেখি সে পথে পা না বাড়িয়ে যাতনাকে সঙ্গী করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন।কবি বলেন-
'ভালোবাসা মিলনে মলিন হয়, বিরহে উজ্জ্বল'।

নিজের ভালোবাসার মানুষ যে চাইলেও কখনো দুরে যেতে পারেনা তা কবির এ কথাটায় স্পষ্ট-
" তুমি জানো, পাড়া প্রতিবেশী জানে পাইনি তোমাকে
অথচো রয়েছো তুমি এই কবি সন্ন্যাসীর ভোগে আর ত্যাগে"।

বিরহের সাগরে ডুব দিয়ে কি রত্ন কবি পেয়েছেন! তা কবিই ভালো বলতে পারবেন।

আপোষহীন এ কবিকে খ্যাতির মোহ কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। প্রদীপের আলোয় আসার জন্য, সবার কাছে নিজেকে জাহির করার জন্য অন্যরা যেখানে নেশাগ্রস্থ, কবি সেখানে নিজেকে থামিয়ে দিয়েছেন। থামিয়ে দিয়েছেন নিজের প্রয়োজনে, নিজের জীবনকে যাপনের প্রয়োজনে। এখানে কবির উপলব্ধি হল

'নিজেকে দেবার মত সময় না থাকলে সে সময়ের মূল্য আমার কাছে নেই'।

কত গাঢ় উপলব্ধি। তার 'যে জ্বলে আগুন জ্বলে' বইটি প্রকাশ হলে তিনি প্রচুর সাড়া পেলেন। সে বছর বইটি একুশে বইমেলার বেস্ট সেলার ছিল। প্রকাশকরা আরো বই দেবার জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু তার তো সস্তা জনপ্রিয়তার ক্ষুধা ছিল না। তাই নিজেকে একপ্রকার আত্মগোপনে নিয়ে গেলেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে কাটাতে লাগলেন নিঃসঙ্গ জীবন। সুদীর্ঘ ২৬ বছর পর বের হল তার দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ 'কবিতা ৭১'।

কবির যখন চোখ নষ্ট হবার উপক্রম তখন তাকে বলা হলো প্রধানমন্ত্রী বরাবর সাহায্যের আবেদন করতে। কবি তখন বলেছিলেন-
'যে হাত দিয়ে কবিতা লিখেছি সে হাত দিয়ে সাহায্যের আবেদন করতে পারবো না'।

পরে অবশ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বপ্রণোদিত হয়ে তার চিকিৎসার সব খরচ বহনের ঘোষণা দিয়েছেন। দেরীতে হলেও ২০১৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ভীরু কাপুরুষ অযোগ্যদের ভীড়ে বাংলার আকাশে মিটি মিটি জ্বলতে থাকা এ তারাগুলো আরো বহুদিন ভালো থাকুক। ১৯৪৮ সালে নেত্রকোনায় জন্ম নেয়া এ কবির জন্মদিনে অনেক শ্রদ্ধা।

 

লেখক: বাদশাহ ফয়সাল
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।