সাংবাদিকদের আচরণবিধি-প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট ১৯৭৪

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ২৪ জানুয়ারী ২০২০ সময়ঃ দুপুর ২ঃ৪৫
সাংবাদিকদের আচরণবিধি-প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট ১৯৭৪
সাংবাদিকদের আচরণবিধি-প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট ১৯৭৪

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্কঃ

সাংবাদিকতা হলো মূলত একটি সমাজ সংস্কারমূলক বা সমাজসেবামূলক পেশা। এটি একটি মহৎ পেশাও বটে। সংবাদকর্মীদের জাতির বিবেক বলে আখ্যায়িত করা হয়। যার কারণে সমাজে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক কিংবা গঠনমূলক বা বিরূপ প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নাৎসি জেনারেল গোয়েবলস বলেছিলেন, “একটা গ্যাস চেম্বারের বিস্ফোরণে কয়েক শ’ লোক মারা যেতে পারে, কিন্তু একটি পরিকল্পিত মিথ্যা লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।” তাই তো বাংলাদেশের সংবাদপত্র, সংবাদসংস্থা এবং সাংবাদিকদের কিছু নিয়মকানুন ও আচরণবিধি অনুসরণ করে চলতে হয়। প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট, ১৯৭৪ এর ১১ (এগার) টি ধারা অনুযায়ী প্রণীত সংবাদপত্র, সংবাদসংস্থা এবং সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয় আচরণবিধি নিম্নে তুলে ধরা হলো :

১। জাতিসভা বিনাশী এবং দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখ-তা ও সংবিধানবিরোধী বা পরিপন্থী কোন সংবাদ অথবা ভাষ্য প্রকাশ না করা।

২। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অর্জনকে সমুন্নত রাখা এবং এর বিরুদ্ধে প্রচারণা থেকে বিরত থাকা।

৩। জনগণকে আকর্ষণ করে অথবা তাদের ওপর প্রভাব ফেলে এমন বিষয় জনগণকে অবহিত রাখা একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব। জনগণের তথা সংবাদপত্রের পাঠকগণের ব্যক্তিগত অধিকার ও সংবেদনশীলতার প্রতি পূর্ণ সম্মানবোধসহ সংবাদ ও সংবাদভাষ্য রচনা ও প্রকাশ করা।

৪। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের প্রাপ্ত তথ্যাবলীর সত্যতা ও নির্ভূলতা নিশ্চিত করা।

৫। বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য কোনরূপ শাস্তির ঝুঁকি ছাড়াই জনস্বার্থে প্রকাশ করা। এ ধরনের জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ যদি সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে থাকে এবং প্রাপ্ত তথ্য যৌক্তিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য বিবেচিত হয়, তবে এ ধরনের প্রকাশিত সংবাদ থেকে উদ্ভূত প্রতিকূল পরিণতি থেকে সাংবাদিককে রেহাই দেয়া।

৬। গুজব ও অসমর্থিত প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বে যেগুলোকে চিহ্নিত করা এবং যদি এসব প্রকাশ করা অনুচিত বিবেচিত হয় তবে সেগুলো প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা।

৭। যে সকল সংবাদের বিষয়বস্তু অসাধু এবং ভিত্তিহীন অথবা যেগুলোর প্রকাশনায় বিশ্বাস ভঙ্গের আশঙ্কা আছে সে সকল সংবাদ প্রকাশ না করা।

৮। সংবাদপত্র ও সাংবাদিক বিতর্কিত বিষয়ে নিজস্ব মতামত জোরালোভাবে ব্যক্ত করার অধিকার রাখেন। কিন্তু এরূপ করতে গিয়ে :

(ক) সত্য ঘটনা এবং মতামতকে পরিচ্ছন্নভাবে প্রকাশ করা।

(খ) পাঠককে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কোন ঘটনাকে বিকৃত না করা।

(গ) মূল ভাষ্য অথবা শিরোনামে কোন সংবাদকে বিকৃত না করা বা অসাধুভাবে চিহ্নিত না করা।

(ঘ) মূল সংবাদের ওপর মতামত পরিচ্ছন্নভাবে তুলে ধরা।

৯। কুৎসামূলক যা জনস্বার্থ পরিপন্থী না হলে ব্যাহত ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থবিরোধী হলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষ স্বাক্ষরিত যেকোন বিজ্ঞাপন সংবাদপত্রে প্রকাশের অধিকার সম্পাদকের আছে। কিন্তু এরূপ বিজ্ঞাপনের প্রতিবাদ করা হলে সম্পাদককে তা বিনা খরচে মুদ্রণের ব্যবস্থা করা।

১০। ব্যক্তি অথবা সম্প্রদায় বিশেষ সম্পর্কে তাদের বর্ণ, গোত্র, জাতীয়তা, ধর্ম অথবা দেশগত বিষয় নিয়ে অবজ্ঞা বা মর্যাদাহানিকর বিষয় প্রকাশ না করা। জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িকতাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা।

১১। ব্যক্তি বিশেষ, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান অথবা কোন গোষ্ঠী বা বিশেষ শ্রেণীর মানুষ সম্পর্কে তাদের স্বার্থ ও সুনামের ক্ষতিকর কোন কিছু যদি সংবাদপত্র প্রকাশ করে তবে পক্ষপাতহীনতা ও সততার সাথী সংবাদপত্র বা সাংবাদিকের উচিত ক্ষতিকর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান/ সংস্থাতে দ্রুত এবং সংগত সময়ের মধ্যে প্রতিবাদ বা উত্তর দেয়ার সুযোগ প্রদান।

১২। প্রকাশিত সংবাদ যদি ক্ষতিকর হয় বা বস্তুনিষ্ঠ না হয় তবে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার সংশোধন বা ব্যাখ্যা করা এবং ক্ষেত্র বিশেষ ক্ষমা প্রার্থনা করা।

১৩। জনগণকে আকর্ষণ করে অথচ জনস্বার্থ পরিপন্থী চাঞ্চল্যকর মুখরোচক কাহিনীর মাধ্যমে পত্রিকা কাটতির স্বার্থে রুচিহীন ও অশালীন সংবাদ এবং অনুরূপ ছবি পরিবেশন না করা।

১৪। অপরাধ ও দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সংবাদপত্রের যুক্তি সঙ্গত পন্থা অবলম্বন করা।

১৫। অন্যান্য গণমাধ্যমের তুলনায় সংবাদপত্রের প্রভাবের ব্যক্তি ও স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি। এ কারণে যে, সাংবাদিক সংবাদপত্রের জন্য লিখবেন তিনি সূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সংবাদের সত্যতা সম্পর্কে বিশেষভাবে সমাধান থাকা এবং ঝুঁকি এড়ানোর জন্য সূত্রসমূহ সংরক্ষণ করা।

১৬। কোন অপরাধের ঘটনা বিচারাধীন থাকাকালীন সব পর্যায়ে তার খবর ছাপানো এবং মামলাবিষয়ক প্রকৃত চিত্র উদঘাটনের জন্য আদালতের চূড়ান্ত রায় প্রকাশ করা সংবাদপত্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে বিচারাধীন মামলার রায় প্রভাবিত হতে পারে, এমন কোন মন্তব্য বা মতামত প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত ঘোষণার আগ পর্যন্ত সাংবাদিককে বিরত থাকা।

১৭। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত পক্ষ বা পক্ষসমূহের প্রতিবাদ সংবাদটিতে সমগুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ছাপানো এবং সম্পাদক প্রতিবাদলিপির সম্পাদনাকালে এর চরিত্র পরিবর্তন না করা।

১৮। সম্পাদকীয়ের কোন ভুল তথ্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ যদি প্রতিবাদ করে, তবে সম্পাদকের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে একই পাতায় ভুল সংশোধন করে দুঃখ প্রকাশ করা।

১৯। বিদ্বেষপূর্ণ কোন খবর প্রকাশ না করা।

২০। সম্পাদক কর্তৃক সংবাদপত্রের সকল প্রকাশনার পরিপূর্ণ দায়িত্ব স্বীকার করা।

২১। কোন দুর্নীতি বা কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক বা অন্য কোন অভিযোগ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রতিবেদকের উচিত ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে সাধ্যমতো নিশ্চিত হওয়া এবং প্রতিবেদককে অবশ্যই খবরের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করার মতো যথেষ্ট তথ্য যোগাড় করা।

২২। প্রতিবাদ হয়নি এমন দায়িত্বশীল প্রকাশনা খবরের উৎস হতে পারে। তবে পুনঃমুদ্রণ করা হয়েছে নিছক এই অজুহাতে কোন সাংবাদিক কোন সাংবাদিকের কোন খবর সম্পর্কে দায়িত্ব না এড়ানো।

২৩। সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের অধঃপতন তুলে ধরা সাংবাদিকের দায়িত্ব, তবে নারী-পুরুষ গঠিত অথবা কোন নারী সংক্রান্তÍ প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিকের অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা।

২৪। কোন ব্যক্তি সংবাদপত্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকরূপে চাকরি গ্রহণকালে আচরণবিধির পরিশিষ্টে উল্লেখিত শপথনামা ‘‘ক’’ সম্পাদকের সামনে পাঠ ও স্বাক্ষরদান করতে বাধ্য থাকা।

২৫। প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ১১-(বি) ধারা অনুযায়ী সংবাদপত্র প্রকাশক আচরণবিধির পরিশিষ্টে উল্লেখিত শপথনামা ‘‘খ’’ পাঠ ও স্বাক্ষর করতে বাধ্য থাকা।

এই বিধি ও নীতিমালাগুলো বাংলাদেশের সকল সংবাদপত্র, সংবাদসংস্থা ও সাংবাদিকগণ অনুসরণ করে চললে সমাজে অবশ্যই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বার্তাজগৎ২৪/সা/হ

Share on: