সুনামগঞ্জে এমপির মদদে কয়লা আমদানীকারক সমিতির নামে শত শত কোটি টাকা আত্বসাতের অভিযোগ

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ১৫ নভেম্বর ২০১৯ সময়ঃ রাত ৩ঃ০৯
সুনামগঞ্জে এমপির মদদে কয়লা আমদানীকারক সমিতির নামে শত শত কোটি টাকা আত্বসাতের অভিযোগ
সুনামগঞ্জে এমপির মদদে কয়লা আমদানীকারক সমিতির নামে শত শত কোটি টাকা আত্বসাতের অভিযোগ

ষ্টাফ রিপোর্টার, সুনামগঞ্জ: 

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপ নামের প্রতিষ্ঠানটির ব্যানারে শত শত কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ অনেকদিনের। চাঁদাবাজির টাকা থেকে অর্জিত অর্থে এমপি রতনসহ তার চক্রের প্রায় সবাই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। চক্রের অন্যতম দুই সদস্য হলেন তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির সভাপতি আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ও সচিব রাজেশ তালুকদার।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুদকে সমিতির শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন কয়লা আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও এলাকাবাসীর পক্ষে সেলিম ইকবাল নামের এক ব্যাক্তি। অভিযোগ সূত্র বলছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সভাপতি প্রার্থী হন তৎকালীন তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন খান এবং বিএনপি থেকে তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর (উত্তর) ইউনিয়নের বড়ছড়া গ্রামের আলকাছ উদ্দিন খন্দকার। কিন্তু সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেন এবং নিজের ক্ষমতাবলে বিএনপির প্রার্থী আলকাছ উদ্দিন খন্দকারকে বিজয়ী ঘোষণা করতে নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করেন। সভাপতির আসন দখল করার পর বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার লালারগাও গ্রামের রাশেন্দ্র তালুকদারের ছেলে এমপি রতনের মদতপুষ্ট রাজেশ তালুকদারকে সমিতির সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়ে শুরু হয় সমিতির নামে চাঁদাবাজি । তখন থেকেই চলছে তাদের চাঁদাবাজির রাজত্ব। ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যাদের কোনো সম্পৃক্ততাও ছিল না হঠাৎ করে এমপির ছত্রছায়ায় টাকার প্রভাবে বিএনপি নেতা আলকাছ উদ্দিন খন্দকার বনে যান তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও তার ছেলে মঞ্জুর খন্দকার হয়ে যান সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছর পর পর নির্বাচন দেয়ার নিয়ম থাকলেও এমপির মদদে আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ ১১ বছর তাহিরপুর কয়লা আমদানীকারক সমিতির সভাপতির দায়িত্বে বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। এই দীর্ঘ সময় সমিতির নাম ভাঙিয়ে প্রতি ৫০ টন কয়লা ও চুনা পাথর থেকে ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করে যাচ্ছেন তারা। এই চাঁদা আদায়ের রশিদগুলোর কোনটাতেই বহি নম্বর দেয়া থাকে না। স্থানীয়দের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত কত কোটি টন কয়লা ও চুনাপাথর এ দুটি শুল্ক ষ্টেশন দিয়ে আমদানি হয়েছে তার সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে সরকারের রাজস্ব বিভাগে।এ হিসাব টানলেই তাদের সঠিক চাঁদা আদায়ের হিসাব বের হয়ে আসবে। এছাড়াও নতুন ব্যাবসায়ীদের সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত করার সময়ে সমিতির নামে ২০ হাজার টাকার রশিদ দিলেও মূলত প্রতি সদস্য থেকে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, বিগত ১১ বছরে তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির অধীন ২টি শুল্ক ষ্টেশনের পাটলাই নদী পথে প্রতিদিন প্রায় ৩শ ষ্টিল বডির বাল্কহেড নৌকা ও কার্গো কয়লা, চুনা পাথর পরিবহন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। এসব কয়লা ও চুনা পাথরবাহী নৌকা থেকে আমদানিকারক সমিতির নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে এই চক্রটি। এমনকি দেশের টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে সমিতির সভাপতি আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ও তার ছেলে মঞ্জুর খন্দকারের বিরুদ্ধে। বিগত ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল জাতীয দৈনিক যুগান্তরসহ একাধিক জাতীয় পত্রিকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ”৬২০ জনের খোজে পুলিশ” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। ঐ সংবাদে সুনামগঞ্জ জেলার ১২ জন শীর্ষ হুন্ডি ব্যবসায়ীর নাম আসে যার নেতৃত্বে রয়েছেন আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ও তার ছেলে মঞ্জুর খন্দকার। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলকাছ উদ্দিন খন্দকার। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ সত্য নয়। মামলার কারণে সমিতির নির্বাচন হচ্ছে না। এজন্য তিনি দীর্ঘ দিন দায়িত্বে আছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের আগ পর্যন্ত এই আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ট্যাকেরঘাটের চুনাপাথর কোয়ারীতে মাটি কাটার শ্রমিকদের সর্দার হিসেবে কর্মরত ছিলেন । পরবর্তীতে হঠাৎ করেই শ্রমিকদের জনবল দেখিয়ে তৎকালীন বিএনপির এমপির সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে এবং বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী বনে যায়। সেই সময় আলকাছ উদ্দিন তৎকালীন এমপির লোক পরিচয়ে নিজেই সমিতি করে হয়ে যায় সভাপতি। একাধারে প্রায় এক যুগ সমিতি পরিচালনা করেন। এক যুগে সমিতির নাম ভাঙিয়ে লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে চাঁদাবাজি করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যান। সে সময় বিএনপির তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি জনসভায় যোগ দিতে ট্যাকেরঘাট আসলে তাকে স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত ধানের শীষ উপহার দেন এই আলকাছ উদ্দিন খন্দকার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলকাছ উদ্দিন হয়ে যান আওয়ামী লীগ কর্মী। যে এলাকার পাথর উত্তোলনের কোয়ারীতে আলকাছ উদ্দিন মাটি কাটার কাজ করতেন, সেই এলাকায় গত চার বছর আগে বড়ছড়াতে জয়বাংলা বাজার নামে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেছেন সম্পূর্ন নিজের জায়গায়।অবশ্য বাজারটি করাার সময় অনেকের জায়গা জোড়পূর্বক দখলেরও অভিযোগ লোকমুখে শুনা যায়। সে বাজারে রয়েছে ৮০০ দোকান কোঠা। প্রতিটি দোকানের জায়গা বিক্রি করেছেন ৬০ হাজার টাকায় যার মোট মূল্য আসে চার কোটি আশি লাখ টাকা। সে বাজারেই বর্তমানে তার রয়েছে কয়েকটি বিলাস ভবনসহ ,বাজার থেকে কিছুটা দূরত্বেই রয়েছে তিনতলা ২টি বাড়ি। শুধু তাই নয় বাজারের জন্য বিদ্যুৎ ক্রয় করে আনার নাম করে প্রতি দোকান থেকে ৮০০০টাকা হিসেবে নেয়া হয়েছে চৌষট্টি লাখ টাকা। নিজের এলাকা ছাড়াও সুনামগঞ্জ জেলা শহরে আলকাছ উদ্দিনের রয়েছে একাধিক বাড়ি-মার্কেটসহ অসংখ্য জায়গা। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের নবীনগরে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে একটি হাসপাতাল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে তার। এছাড়ারাও সুনামগঞ্জের পার্শ্ববর্তী হালুয়ারঘাট এলাকায় রয়েছে বিশাল দুটি ইটা খোলা। এই ইটা খোলা দুটির অধিকাংশ জায়গাই জোড়পূর্বক দখলের অভিযোগ রয়েছে। যে আলকাছের এক সময় দিনাতিপাত করতেই কষ্ট হতো কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি আজ শত শত কোটি টাকার মালিক। তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির নামে শত শত কোটি টাকা চাঁদা উত্তোলন করলেও কোনদিন সমিতি এলাকার রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন করেননি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

বার্তাজগৎ২৪/ এম এ 

 

Share on: