হ্যামলেট’-এ উপেক্ষিত কিশোরী ওফেলিয়ার গল্প

প্রকাশিতঃ ৩০ মে ২০১৮ সময়ঃ দুপুর ১২ঃ৫৯
হ্যামলেট’-এ উপেক্ষিত কিশোরী ওফেলিয়ার গল্প
হ্যামলেট’-এ উপেক্ষিত কিশোরী ওফেলিয়ার গল্প

কথিত সর্পদংশনে’ সদ্যপ্রয়াত ডেনমার্কের অধিপতি রাজা হ্যামলেটের প্রেতাত্মা তখন এলসিনো ক্যাসলের আশপাশে কোথাও অবস্থান করছিল। প্রহরীরা পর পর দু’রাত রাজপ্রেতদর্শনের পর বিস্মিত ও আতঙ্কিত। তারা রাজকুমার হ্যামলেটের অন্তরঙ্গ বন্ধু হোরাশিওকে ঘটনাটি জানায়। কৌতূহলী হোরাশিও সত্য-মিথ্যে যাচাই করতে গিয়ে নিজেও মধ্যরাতে রাজপ্রেতাত্মার মুখোমুখি হয়— অবিকল সেই রাজার মতো, ক’দিন আগেও তিনি ছিলেন ডেনমার্কের ক্ষমতাধর অধীশ্বর।

হোরাশিওর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে কিং হ্যামলেটের অনাগ্রহ এবং মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়া তাকে ভাবিয়ে তোলে। যদি তার জায়গায় প্রিন্স হ্যামলেট থাকত, হাতলে তিনি কি চলে যেতে পারতেন?

বন্ধুর মুখে পিতার প্রেতাত্মার কথা শুনে প্রিন্স হ্যামলেট নিজেই এগিয়ে আসে, প্রয়াত পিতা নিশ্চয়ই তাকেও দেখা দেবেন।

একইভাবে মধ্যরাতে এলসিনো ক্যাসলের দেয়ালের ওপর রাজা আবির্ভূত হন। আবেগাপ্লুত প্রিন্স হ্যামলেট বন্ধুর বারণ উপেক্ষা করে পিতার ছায়ামূর্তি অনুসরণ করতে থাকে। একসময় পিতা ছেলেকে নিজের মৃত্যুর বৃত্তান্ত শোনান: বাগানে শায়িত অবস্থায় তিনি যখন দিবানিদ্রামগ্ন ছিলেন, তখন তাকে কোনো সাপ দংশন করেনি, সর্পদংশনে তার মৃত্যু ঘটেনি। বরং এখন যিনি ডেনমার্কের রাজা কিং ক্লডিয়াস, যিনি তারই সহোদর, তার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তার মৃত্যু ঘটেছে। তিনি যখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন, তার কানে তীব্র বিষ ডেলে দেয়া হয়। এ বিষ অতিদ্রুত রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়ে তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। ঘাতক ক্লডিয়াস ডেনমার্কের রাজসিংহাসন দখল করেন, রানী গারট্রুডকে বশীভূত করে তাকে বিয়ে করেন। ছায়ামূর্তি তার পুত্রকে জানান, এ ক্লডিয়াসই হচ্ছে বিষধর সাপ। ছায়ামূর্তি পুত্রের কাছে আকুতি জানান, সে যেন পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়। তবে পুত্রকে স্মরণ করিয়ে দেন, গারট্রুড তার গর্ভধারিণী মা, তার প্রতি কোনো বিদ্বেষ পোষণ করা যাবে না, প্রতিশোধ তার বেলায় প্রযোজ্য হবে না। তার প্রায়শ্চিত্ত সে নিজেই করবে। প্রিন্স হ্যামলেটও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রতিশোধ নেবেই। সন্দেহ, অবিশ্বাস, ঘৃণা ও অনিশ্চয়তা তার ভেতর এক দার্শনিক সত্তার উদ্ভব ঘটায়। প্রহরী ও বন্ধুকে প্রতিজ্ঞা করায়— ছায়ামূর্তির বিষয় কারো কাছে প্রকাশ করা যাবে না। হ্যামলেটের অসংলগ্ন আচরণ, মধ্যরাতে দেখা প্রেতাত্মার ছবি, বন্ধু হোরাশিওর প্রশ্ন, মায়ের অনাকাঙ্ক্ষিত ক্লডিয়াসপ্রীতি— এমন একটি অস্থির অবস্থায় শেক্সপিয়ার তার কণ্ঠে তুলে দেন:

There are more things in Heaven and earth horatio

Than are dreamt of in your philosophy.

হ্যামলেট তার প্রতিশোধ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কর্মকৌশল হিসেবে অপ্রকৃতিস্থ মানুষের ভূমিকা বেছে নেয়। যদি রাজা ক্লাডিয়াস তার উদ্দেশ্যের এতটুকুও আঁচ করতে পারেন, তাহলে যে হ্যামলেটের মৃত্যু অনিবার্য, এটা তার জানাই।

পিতার অস্বাভাবিক ও অকালমৃত্যু এবং পুনরায় মাতার রাজপত্নিত্ব গ্রহণ হ্যামলেটের মানসিক অস্থিতাবস্থার জন্য দায়ী, নাকি তার অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে অন্য কোনো নিগূঢ় রহস্য রয়েছে, তা আবিষ্কার করতে উতলা হয়ে আছেন কিং ক্লডিয়াস, বিচলিত হয়ে উঠেছে মা গারট্রুড। তার ওপর আপতিত রাজার গোয়েন্দা দৃষ্টি।

দুই বন্ধু রোজেনক্রাঞ্জ ও গিল্ডেনস্টার্নকে ক্লডিয়াস চর নিয়োজিত করেন। হ্যামলেটও বুঝে গেছে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে সতর্ক। এক্ষেত্রে তার অপ্রকৃতিস্থ অবস্থাই হবে তার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যুহ।

রাজার প্রিয় দক্ষিণ হস্ত পলোনিয়াস ও তার পুত্র ফরাসি দেশে কর্মরত লেয়ার্টেস হ্যামলেটের নিতান্ত অপছন্দের মানুষ। লেয়ার্টেস যখন নতুন রাজার অভিষেকে এসেছে বলে জানাল, হ্যামলেট বলল, তুমি এসেছ আমার মায়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। কিন্তু তারই ভগ্নি পলোনিয়াসকন্যা ওফেলিয়াই তার একদা প্রিয়তমা, আচরণে যত অসঙ্গতি থাকুক, সম্ভবত তখনো হ্যামলেট তাকেই ভালোবাসে।

হ্যামলেটের প্রেম আসলে ভাঁওতা, লেয়ার্টেস বোনকে সতর্ক করে দেয়; এমনকি পলোনিয়াসও মেয়েকে সতর্ক করেন, প্রিন্স হ্যামলেটের প্রেম হচ্ছে ছলনা, পাখি ধরার ফাঁদ। একসময় সে সটকে পড়বে এবং রাষ্ট্রীয় আচার অনুযায়ী বিয়ে করবে; যেখানে অমাত্যকন্যা ওফেলিয়ার কোনো স্থান নেই।

পিতৃআজ্ঞা পালন করে ওফেলিয়া যখন হ্যামলেটের পত্র ফিরিয়ে দেয়, হ্যামলেটের আগমন আর প্রত্যাশিত নয় বলে জানায় উদ্ভ্রান্ত রাজপুত্র তার কাছে আসে, সজোরে তার কবজি চেপে ধরে, বিসদৃশ আচরণ করে, একসময় বলে ওঠে, একদিন তোকে আমি ভালোবাসতাম। পরক্ষণেই হ্যামলেট বলে, তাকে ভালোবাসত না। বরং ওফেলিয়ার উচিত মঠে গিয়ে সন্ন্যাসিনীর জীবনযাপন করা। সে কেন পাপীর সন্তানের জননী হবে? হ্যামলেট নারী জাতির প্রতিই বিদ্বেষপ্রসূত মন্তব্য করতে থাকে।

পলোনিয়াস রাজাকে জানায়, তার মেয়ে ওফেলিয়া হ্যামলেটকে প্রত্যাখ্যান করায় হ্যামলেট মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অসংলগ্ন আচরণ করছে। কিং ক্লডিয়াস বলে, তার কথায় অসংলগ্নতা থাকতে পারে, কিন্তু তাকে উন্মাদ মনে করার কারণ নেই।

হ্যামলেটকে মানসিক স্থিতাবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য তাকে আমোদিত করার পরিকল্পনা করা হয়। আগত একটি নাট্যদলকে হ্যামলেট লুফে নেয়— দল অভিনয় করবে, কিন্তু নাট্য নির্দেশনা দেবে হ্যামলেট স্বয়ং। নাটকের মধ্যে হ্যামলেট ঢুকিয়ে দেয়, তার পিতার হত্যাকাণ্ডের প্রতীকী কাহিনী, গভীর রাতে ছায়ামূর্তির কাছে যা সে শুনেছে। ঘটনা যদি সত্যি হয়, ক্লডিয়াসের আচরণ ও অভিব্যক্তিতেই তা ধরা পড়বে। রাজা-রানীসহ অমাত্যবর্গ নাটকের দর্শক ওফেলিয়াও এসেছে প্রিন্স হ্যামলেট নির্দেশিত নাটক দেখতে। মা গারট্রুড তাকে কাছে ডাকলেও হ্যামলেট ইতস্তত ওফেলিয়ার কোলে মাথা রেখে নাটক দেখতে থাকে এবং মাঝে মধ্যে নারী ও যৌনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোঁচা মেরে মন্তব্য করা অব্যাহত রাখে।

নাটকের দৃশ্যপটে প্রথমে রাজা ও রানীর নিবিড় সম্পর্ক, অতঃপর খলনায়ক অ্যানন ঘুমন্ত রাজার কানে বিষ ঢেলে দেয়। রানী যখন ফিরে আসে, রাজা বিষক্রিয়ায় মৃত। অ্যানন রানীকে সান্ত্বনা দিতে দিতে ভালোবাসার কথা শোনায়— খলনায়কের ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েও রানী তারই অঙ্কশায়িনী হয়ে পড়ে। হ্যামলেট যেমন ভেবেছে, নিজ পাপের প্রতিবিম্ব নাটকে দেখে অস্থির ক্লডিয়াস উঠে পড়ে, দর্শক মঞ্চ ছেড়ে যায়। হ্যামলেট তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে যখন তার কাছে পৌঁছে, দেখে ক্লডিয়াস প্রার্থনারত। এ অবস্থায় নিহত হলে স্বর্গপ্রাপ্তি নিশ্চিত। প্রতিশোধ তাহলে হবে না। হ্যামলেট পরবর্তী সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। নাটক ক্লডিয়াসকে যেভাবে বিচলিত করেছে, তাতে হ্যামলেটের বন্ধু হোরাশিও স্বীকার করেছে, ক্লডিয়াসই প্রকৃত ঘাতক, সর্পদংশের বানোয়াট কাহিনী আর মেনে নেয়া যায় না।

মায়ের ডাকে একসময় হ্যামলেট তার সঙ্গে কথা বলতে যায়। কী কথা তা শোনার জন্য আড়ালে আড়িপাতে পলোনিয়াস। মায়ের প্রশ্নের ঝাঁঝাল ও বিক্ষিপ্ত জবাব দিতে দিতে আড়ালের মানুষটিকে ক্লডিয়াস ভেবে হত্যা করে। এ রক্তারক্তি যখন রানীকে বিচলিত করে তোলে, হ্যামলেট মাকে বলে, রাজাকে হত্যা করে তার ঘাতক ভ্রাতাকে স্বামী হিসেবে বরণ করার মতো ঘটনাই, তাই না?

তার স্বামী হত্যার বিষয়টি যখন তার কাছে খোলাসা হতে শুরু করে, হ্যামলেট প্রকাশ্যেই পলোনিয়াসের মরদেহকে উদ্দেশ করে বলে, আমি তাকে কিং ক্লডিয়াস মনে করেছিলাম। এ উন্মাদের হাত থেকে বাঁচার জন্যই ক্লডিয়াস তাকে ইংল্যান্ড পাঠিয়ে দেন। সঙ্গে দুই অনুচর রোজেনক্রাঞ্জ ও গিল্ডেনস্টার্ন আর তাদের হাতে সিল করা রাজার চিঠি, যাতে নির্দেশ করা আছে, যেন দ্রুত হ্যামলেটের মৃত্যুর আয়োজন করা হয়।

কিন্তু রাজমোহরাঙ্কিত এ চিঠির ভাষ্য কৌশলে হ্যামলেট বদলে দেয়। তাতে পত্রবাহক দুজনকে হত্যার কথা বলা হয়।

পিতা পলোনিয়াস নিহত, প্রেমিক হ্যামলেট তাকে যাচ্ছেতাই বলে যাচ্ছে, অহঙ্কারী ভাই লেয়ার্টেস ফ্রান্সে— ওফেলিয়ার অসহায় দশা তখন বর্ণনার অতীত। আবার তার প্রেমিকই অজ্ঞাতে পিতার ঘাতক। লেয়ার্টেস ফিরে এসে পিতৃহত্যার জন্য ক্লডিয়াসকেই দায়ী করে। ক্লডিয়াস জানিয়ে দেয়, তার পিতার হত্যাকারী হচ্ছে হ্যামলেট। প্রতিশোধ নিতে হবে তার ওপরই।

ইংল্যান্ড যাওয়ার পথে হ্যামলেটের তরী জলদস্যু আক্রান্ত হয়। দস্যুরা তার সঙ্গে সদাচরণই করে। একসময় প্রিন্স হ্যামলেট ডেনমার্কে অবতরণ করে, তার দুই সহযোগী নিজেদের মৃত্যুর ফরমান নিয়ে পৌঁছে ইংল্যান্ডে।

কিং ক্লডিয়াসের পরিকল্পনা অনুযায়ী যে হ্যামলেটের মরদেহ ইংল্যান্ডে পড়ে থাকার কথা, সে আবার ফিরে এসেছে! কাল হয়তো সে রাজদরবারে এসে হাজির হবে।

ক্লডিয়াস লেয়ার্টেসের মনে প্রতিশোধপরায়ণতা জাগিয়ে তোলে। একসময় লেয়ার্টেসও চায়, হ্যামলেট ফিরে আসুক। তার হাতেই হোক পিতার ঘাতকের মৃত্যু। কিন্তু তার মৃত্যু তো নিশ্চিত করতে হবে। ফ্রান্স থেকে আনা প্রাণসংহারক তলোয়ারের ব্লেডে একটু পানি লাগিয়ে একটি পোচ দিলেই যথেষ্ট। বেদনায় নীল হয়ে যাবে হ্যামলেট। মৃত্যুই হবে একমাত্র প্রতিকার।

যখন হ্যামলেটের প্রত্যাবর্তনের বার্তা ক্লডিয়াসের কাছে পৌঁছে, জলমগ্ন হয়ে ভাগ্যাহত ওফেলিয়ার মৃত্যুসংবাদও দেয় ক্রন্দনরত গারট্রুড।

ফেরার পথে হ্যামলেটের দেখা গোরখোদকদের সঙ্গে, একজন নারীকে সমাহিত করার জন্য গোর খনন করা হচ্ছে।

এদিকে হ্যামলেটকে পানীয় তুলে দেয়া হবে, তাতে মেশানো হয়েছে ঘাতক বিষ। লেয়ার্টেস ও হ্যামলেটের দ্বন্দ্বযুদ্ধ দেখতে আসা রানী গারট্রুড এক চুমুকে শেষ করে দেন হ্যামলেটের জন্য তৈরি করা মরণ পানীয়। বিনাশী আয়োজনে লুটিয়ে পড়লেন রানী।

হ্যামলেটকে আক্রমণ করার ঘোষণা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে লেয়ার্টেস। হ্যামলেট লড়েছে তার দক্ষতা দিয়ে, লেয়ার্টেস সন্ত্রস্ত হয়ে। আচমকা আক্রমণে লেয়ার্টেসের শরীরে তরবারি ঢুকে যায়। আর ঢোকে ব্লেডে লাগানো ভয়ঙ্কর বিষ। মৃত্যুর সময় হ্যামলেটকে জানায়, সব অপরাধ রাজা ক্লডিয়াসের। তখনই সে কিং ক্লডিয়াসকে তরবারিতে বিদ্ধ করে। তার মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য কাপের অবশিষ্ট বিষ জোর করে মুখে ঠেলে দেয়— খাও রাজা, আমার মাকে অনুসরণ করো।

জীবনের শেষনিঃশ্বাসটি ত্যাগ করার আগে লেয়ার্টেস বলে যায়, এটাই কিং ক্লডিয়াসের পাওনা।

লেয়ার্টেস ক্ষমা প্রার্থনা করে। হ্যামলেট বিড়বিড় করে বলে, আমিও তোমাকে অনুসরণ করছি।

এলসিনো ক্যাসলের বাইরে রণবাদ্য ধ্বনিত হয়— ক্রমেই তা এগিয়ে আসছে। বার্তাবাহক জানায়, নরওয়ের প্রিন্স ফরটিনব্রাস ডেনমার্ক বিজয় করে রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ততক্ষণে ‘দ্য রেস্ট ইজ সাইলেন্স’ স্বগতোক্তি করে হ্যামলেট এলিয়ে পড়ে বন্ধু হোরাশিওর বাহুতে। অশ্রুসিক্ত চোখে হোরাশিও বন্ধুকে বিদায় জানায়: Good night, sweet prince, and the flights of angels sing thee to the silence.

বিজয়ী প্রিন্স ফরটিনব্রাস হ্যামলেটের কাহিনী শুনে তাকে রাজকীয় মর্যাদায় সমাহিত করার নির্দেশ দেয়।

প্রিন্স অব ডেনমার্ক হ্যামলেটের জন্য সম্মানসূচক গোলাবর্ষণের শব্দ ভেসে আসে।

শেক্সপিয়ার ‘রোমিও ও জুলিয়েট’-এ জুলিয়েটের উপস্থিতি প্রবল, কিন্তু ‘হ্যামলেট’-এ ওফেলিয়া লেখকের যেমন, ঘটনার পাত্রপাত্রীদেরও তেমনি উপক্ষের শিকার। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন: ‘বাক্যবাগীশ পিতা তাকে ইচ্ছামতো চালাতে চায়, দায়িত্বজ্ঞানহীন ভ্রাতা অকারণে উপদেশ দেয়, বিব্রত-বিচলিত প্রেমিক হ্যামলেট তার সঙ্গে অতিশয় নিষ্ঠুর আচরণ করে।’

মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে তাকে মৃত্যুর পথই বেছে নিতে হয়। রানী গারট্রুড জানিয়েছেন, ওফেলিয়া নদীর ধারে বৃক্ষে আরোহণ করেছিল, ডাল ভেঙে নদীতে পড়ে যায়, একসময় ভেসে ওঠে এ কিশোরীর মরদেহ। আসলে মৃত্যুটি ছিল আত্মহনন।

তিনি আরো লিখেছেন: ‘না, কেউ বাঁচায়নি ওফেলিয়াকে— পিতা না, ভ্রাতা না, না প্রেমিক। বরং বলা যাবে, সবাই মিলে তাকে ঠেলে দিল মৃত্যুর দিকে। অথচ বাঁচার অধিকার তারই ছিল সবচেয়ে বেশি।’

শেক্সপিয়ারও দুর্বিনীত দার্শনিক প্রিন্স হ্যামলেটের বিপরীতে কিশোরী ওফেলিয়াকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেননি। আমাদের যত আক্ষেপই থাকুক, শেক্সপিয়ার তার চরিত্রটিকে হয়তো এভাবেই নির্মাণ করতে চেয়েছেন, জীবনের সীমানা পেরিয়ে যে ভেসে থাকবে লতা-গুল্ম আচ্ছাদিত নদীতে।

এ দৃশ্যই অবিস্মরণীয় হয়ে উঠেছে জন এভারেট সিলাইসের রঙ ও তুলিতে। ১৮৫১ সালে তিনি ভাসমান নিষ্প্রাণ ওফেলিয়াকে এঁকেছেন। প্রতিদিন ১১ ঘণ্টা সপ্তাহে ছয়দিন— পুরো পাঁচ মাস সময় নিয়েছেন। ১৯ বছর বয়সী এলিজাবেথ সিডালকে মডেল করে এ ছবি আঁকা। ১৮৫১-এর ১০ ডিসেম্বর শিল্পী ৩০০ গিনির বিনিময়ে ছবিটি বিক্রি করেন হেনরি ফেরার নামে একজন সংগ্রাহকের কাছে। ১৮৬২ সালে হেনরি ছবিটি বিক্রি করেন ৭৪৮ গিনিতে। এ ছবির দাম এখন কমপক্ষে ৫০ মিলিয়ন ডলার।

১৮৯৪ সালে জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউজ বড় ক্যানভাসে প্রি-র্যাফেলাইট ধাঁচে ওফেলিয়াকে আঁকেন। আর্থার হিউজেস ১৮৫৩তে বিষণ্ন ওফেলিয়াকে আঁকা শেষ করেন; তার বয়স মাত্র একুশ। ফরাসি চিত্রশিল্পী আলেকজান্দ্রে ক্যাবানেলের ওফেলিয়া মধ্যযুগের এক নিস্পৃহ রাজকন্যা। আর্থার হিউজেস ১৮৫২তে এঁকেছেন ওফেলিয়াকে। শেক্সপিয়ারের নারীদের মধ্যে চিত্রশিল্পীদের কাছে জুলিয়েটের চেয়ে কম মনোযোগ পাননি ওফেলিয়া। যাদের হাতে এ নিঃসঙ্গ কিশোরী ছবি হয়ে উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন— জন বেল, জন হ্যামিল্টন মর্টিমার, বেঞ্জামিন ওয়েস্ট, রবার্ট ওয়েস্টল, ফ্রান্সিস ড্যানবে, দান্তে গ্যাব্রিয়েল রসেটি, আর্নেস্ট হার্বার্ট, জর্জ ফালকেনবার্গ, মার্কাস স্টোন, মরিস গ্রিফেনহাগেন, হেনরি নেলসন ও’নীল, ইউজিন ডেলাক্রয়, জ্যঁ ব্যাপতিস্ত বার্টান্ড এবং আরো অনেকে। ৪০০তম জন্মশতবার্ষিকীতে শেক্সপিয়ারের জন্য শ্রদ্ধা, ‘হ্যামলেট’-এ উপেক্ষিত ওফেলিয়ার জন্য ভালোবাসা।

সুত্র – আন্দালিব রাশদী